২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত রফিকুল ইসলামে ছেলে মাজহারুল ইসলাম মামুন। আর এই রফিকুল ইসলাম পরিচিত ছিলেন ‘আদা চাচা’ নামে। আওয়ামী লীগের যে কোনও জনসভায় উপস্থিত থাকতেন আদা চাচা। তাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে এক পরিচিত এবং প্রিয় মুখ ছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাকে চিনতেন। তাকে দেখলেই আদা নিতেন তার কাছ থেকে। সেদিনও প্রিয় আপাকে আদা দিতেই ট্রাকের কাছে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ‘আপাকে তার আদা দেওয়া হয়েছিল কিনা জানি না’, বলেন মামুন।
আদা কুচি কুচি করে কেটে সেটি শুকিয়ে নিয়ে আসতেন আওয়ামী লীগের জনসভায়। পাঞ্জাবির দুই পকেট ভর্তি প্লাস্টিকের কৌটায় করে নিয়ে যেতেন। রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা) বলতেন, কুচি করে নিয়ে যাওয়া এই আদা আমার ছেলেদের (নেতাকর্মীদের) সুস্থ রাখবে গরমে। বাবার স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলেন মাজহারুল ইসলাম মামুন। বাবার দেখাদেখি তিনি নিজেও তখন আওয়ামী লীগের ভক্ত হয়ে ওঠেন। আর এখন তিনি একজন রাজনৈতিক কর্মী।
রাজধানীর খিলগাঁও আওয়ামী লীগ কমিটির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন মামুন। বাবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফজরের নামাজ পড়ে বাড়িতে লাগানো সবজির যত্ন করতেন বাবা। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে বেরিয়ে যেতেন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ অফিসে। আর বাড়ি ফিরতেন সন্ধ্যা আটটায়। সেদিনও তিনি ছিলেন জনসভায়। কিন্তু আর ফিরলেন না। চলে গেলেন যেখান থেকে কেউ আর কোনওদিন ফেরেন না।
কান্না জড়িত কণ্ঠে মামুন বলেন, নেত্রী শেখ হাসিনার জনসভা কোনওদিন মিস করেননি আমার আব্বা। আজ নেত্রী প্রধানমন্ত্রী, কত জনসভা হচ্ছে তার; অথচ আমার বাবা সেখানে নেই। তবে জননেত্রী তার ‘আদা চাচা’কে মনে রেখেছেন জানিয়ে মামুন বলেন, প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই। দলীয় লোকজন খোঁজখবর নেন না। তবে আমরা এখনও আশাবাদী যে, আপা আমাদের জন্য কিছু করবেন।
মামুন বলেন, আব্বা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে গিয়ে যে আর কিছু করেননি, সেটা প্রধানমন্ত্রী জানতেন। তাই, তিনি মারা যাওয়ার পর মর্টগেজ নিয়ে করা বর্তমান এই বাড়ির ব্যাংকের সব ঝামেলা তিনি মিটিয়ে দেন। এই বাড়িতে আমরা ৫ ভাই ৩ বোন একই সঙ্গে থাকি। বাড়ির ভেতরের অবস্থা খুব খারাপ। প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের জন্য একটু স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দেন, তাহলে একটু ভালোভাবে আমরা থাকতে পারতাম।
এদিকে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত রতন সিকদারের স্মৃতিচারণ করে ভাই টুটুল বলেন, রতন হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি মারা যাবেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শুধু তিনি বলছিলেন, আমার ছেলে-মেয়ে দুটোকে দেখে রাইখেন।
টুটুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভাইয়ের মাথার পেছনের খুলি উড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে বারবার জানতে চাইছিলেন, নেত্রীর কী অবস্থা? উনি বেঁচে আছেন তো?
টুটুল বলেন, এমন আওয়ামী লীগার আমি এখনও দেখি না। নেত্রীর জনসভা থাকলে সেখানে সামনে গিয়ে তার ভাষণ শুনতে হতো রতন সিকদারের। আমরা তাকে বলতাম, এত কাছে যাবার দরকার কী! জবাবে তিনি বলতেন, নেত্রীর কথা যদি নিজ কানে না শুনি তাহলে জনসভায় গিয়ে লাভ কী! ঘরে বসে থাকলেই তো পারি!
রতন সিকদারের স্ত্রী নুসরাত জাহান রোজী বলেন, দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তিনি যাত্রাবাড়ীতে থাকেন। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র আর তার ভাইয়ের সহযোগিতায় সংসার চালাচ্ছেন তিনি। তবে খুব কষ্ট হয় আজকের দিনে এভাবে সংসার চালাতে। হিমশিম খেতে হয়, বলেন রোজী। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে যতটা ভালোবাসতেন তিনি, বোধ হয় নিজের মাকেও ততটা ভালোবাসতেন না হয়ত।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত হন সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ও আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ আরও ২৩ জন নেতাকর্মী। আহত হন প্রায় চার শতাধিক। আহতদের মধ্যে অনেকেই পঙ্গু হয়ে গেছেন। অনেককে শরীরে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে ধাতব স্প্লিন্টার।
/জেএ/এবি/
আরও পড়ুন
২১ আগস্ট আশ্চর্যজনকভাবে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়: প্রধানমন্ত্রী