শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন অফিসের মেডিক্যাল অফিসার ডা. সৈয়দা শাহিনুর নাজিয়া সরকারি পদের পাশাপাশি রোগী দেখছেন শরীয়তপুর হাসপাতাল রোডে অবস্থিত নিউ মেট্রো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড ক্লিনিকে। ডা. নাজিয়া তার সরকারি ভিজিটিং কার্ড এবং প্রেসিক্রিপশনে নিজের পরিচিতিতে লিখেছেন, পিজিটি (গাইনি অ্যান্ড অবস্), আল্ট্রাসনোগ্রাফি (ডিএমইউডি), সিসিডি (বারডেম)।আর এর মাধ্যমে ডা. সৈয়দা শাহিনুর নাজিয়া বিএমডিসি’র (বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) নীতিমালা ভঙ্গ করছেন, করছেন রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা।
চিকিৎসকদের অন্যতম সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) বলা আছে, বিএমডিসির স্বীকৃতি নেই এমন কোনও ডিগ্রি বা পদবি কোনও চিকিৎসক নিজের প্রচারে ব্যবহার করতে পারবেন না। কিন্তু বিএমডিসির নির্দেশনা অমান্য করে অনেক চিকিৎসক তার ভিজিটিং কার্ড, সাইনবোর্ড ও প্রেসক্রিপশনে এসব ডিগ্রি ব্যবহার করে চলেছেন। আর এসব ডিগ্রি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা অধিকতর যোগ্য এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে নিজেদের জাহির করেন এবং সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নিয়ে থাকেন অতিরিক্ত ভিজিট। আর এতে করে প্রতারিত হচ্ছেন রোগীরা।
বিএমডিসি থেকে জানা যায়, এফসিপিএস (১,২), এমডি (কোর্স), এমডি (১,২), (থিসিস পর্ব), (লাস্টপার্ট), কোর্স কমপ্লিট (সিসি), এমডি (কোর্স), এমএস (১,২), পিজিটি বা বিএইচএস-এসব ডিগ্রি বা পদবি বিএমডিসির অনুমোদিত নয়, এগুলো চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনও অতিরিক্ত ডিগ্রিও নয়। আবার স্বীকৃত পোস্ট গ্রাজুয়েশন ব্যতীত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, শিশু-গাইনি বিশেষজ্ঞ, সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি ব্যবহারও বিএমডিসি’র নিয়ম অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। চিকিৎসকদের এসব ডিগ্রি ব্যবহার না করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে বিএমডিসি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অ্যাক্ট ২০১০ (২০ ডিসেম্বর, ২০১০-এ প্রকাশিত গেজেট) এর ধারা ২২(১) ও ২৯(১) এর আওতায় MBBS/BDS বাদে অন্য চিকিৎসকদের নামের আগে ডা. (ডাক্তার) পদবি ও নামের পরে ডিগ্রি ব্যবহার অপরাধ। কিন্তু, বিএমডিসির এ নীতিমালা ভঙ্গ করে চলেছেন বেশিরভাগ চিকিৎসক।
পদবি নিয়ে দুর্নীতির আরও মারাত্মক অভিযোগ পাওয়া যায় ডা. মো. ইব্রাহীম নামে অপর এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। ফেসবুকে পাওয়া একটি স্ট্যাটাসে দেখা যায়, তিনি নিজের প্রেসক্রিপশন ও ভিজিটিং কার্ডে লিখেছেন, ‘এম,বি,বি,এস; এফ, আর, সি এস (আমেরিকা),এনাটমী (সার্জারী), আমেরিকা রয়েল কলেজ, আমেরিকা বিশ্ববিদ্যালয়।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ( রেজিস্টার্ড), চক্ষু ও পাকস্থলী বিশেষজ্ঞ।’
কিন্তু, কিভাবে তিনি চোখের পাশাপাশি পাকস্থলীর বিশেষজ্ঞ হতে পারেন এটি যেমন বিস্ময়ের তেমনি এফআরসিএস ডিগ্রি কী করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া যায় সেটিও চরম ধৃষ্টতার পরিচয় বহন করে।
এর প্রেক্ষিতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিভাগীয় এবং জেলা শহরগুলোতে ডা. মো. ইব্রাহীমের মতো অনেক চিকিৎসকই এখন নিজেদের কার্ডে এফআরসিএস (ইউএসএ) ডিগ্রিটি ব্যবহার করছেন।
অথচ ফেলো অব দ্যা রয়্যাল কলেজ অব সার্জন (এফআরসিএস) অর্জন করতে যুক্তরাজ্যে ৫ বছর পড়াশোনা করতে হয়, যেটি কিনা এফআরসিএস (যুক্তরাজ্য) ডিগ্রি হিসেবে বহুল পরিচিত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে কোনও রয়্যাল কলেজ নেই। অথচ সেটিকেই চিকিৎসাসেবায় পুঁজি করছেন অনেক চিকিৎসক। আবার অনেক চিকিৎসক দেশে থেকেই টাকার বিনিময়ে পাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডিগ্রি। অনেকেই এফআইসিএস (ইউএসএ) ডিগ্রি নিচ্ছেন ১ হাজার ডলারের বিনিময়ে। দেশে বসেই অনলাইনে ফর্ম ফিলাপের পর ১ হাজার ডলার এবং শিক্ষাজীবনসহ চিকিৎসক জীবনের সব সনদপত্র জমা দেওয়া যায়। আর এরপর তিনি এফআইসিএস (ইউএসএ) অর্জন করেন কোনও ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই!
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা.লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘রয়্যাল কলেজ ইউএসএ-তে প্রতিষ্ঠিত নয়, এটি যুক্তরাজ্যে অবস্থিত। সুতরাং, কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘ফেলো অব দ্যা রয়্যাল কলেজ অব সার্জন (এফআরসিএস) ডিগ্রি নেওয়া সম্ভব নয়। অতএব যারা এটি লিখছেন, তারা নির্জলা মিথ্যা কথা বলছেন।’’
ডা.লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘দেশে কিছু চিকিৎসক নামধারী ব্যক্তি কিংবা ভুয়া চিকিৎসক এ জাতীয় মিথ্যা ডিগ্রি ব্যবহার করছেন হরদম। তারা এসব ডিগ্রি দিয়েই রোগীদের আকৃষ্ট করছে।এরা মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাদের অর্থহানি করছে, স্বাস্থ্যহানি করছে এমনকি জীবনহানিও করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এফআরসিএস চিকিৎসকদেরও প্রতি পাঁচ বছর পর পর নানা ধরনের পরীক্ষা দিতে হয় বিদেশে। কিন্তু আমাদের দেশে সেরকম কোনও ব্যবস্থা নেই। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জন্যও যদি এ ধরনের কিছু দেশে চালু করা যেত তাহলেও এ প্রবণতা কিছুটা রোধ করা সম্ভব হতো।’
নিজের ভিজিটিং কার্ডে বিএমডিসি স্বীকৃত নয় এমন ডিগ্রি ব্যবহার করেছেন কেন এমন প্রশ্ন করা হলে ডা. নাজিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেকেই এসব ডিগ্রি ব্যবহার করছেন, তাদের দেখাদেখি আমিও করেছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইকবাল আর্সলান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএমডিসির রেগুলেশন এবং স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী স্বীকৃত নয় এমন ডিগ্রি ব্যবহার করা নিষেধ চিকিৎসকদের জন্য।’ তিনি বলেন, ‘বিএমডিসি এ বিষয়ে বারবার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকার কারণে বিএমডিসি এ ধরনের কাজে জড়িত চিকিৎসকদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আর এর সুযোগ নিয়েই অনেক চিকিৎসক এখনও নিজেদের জাহির করতে তাদের পরিচিতিতে এসব ডিগ্রি ব্যবহার করে যাচ্ছেন।’
আর বিএমডিসি তার রেজিস্টার্ড চিকিৎসক ছাড়া অন্য কাউকে এ সম্পর্কে কিছু বলতে পারে না জানিয়ে ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘সরকারের অন্যসব বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মতো বিএমডিসির কোনও ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নেই। যার কারণে তারা এ সম্পর্কে সরকারের কাছে সুপারিশও করতে পারে না। যদি বিএমডিসির অন্যান্য বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মতো ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতার অধিকারী হতো, সরকারের কাছে সংগঠনটির সুপারিশ করার ক্ষমতা থাকতো তাহলে কিছুটা হলেও এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।’
ডা. মো. ইব্রাহীম কী করে একইসঙ্গে চক্ষু ও পাকস্থলীর বিশেষজ্ঞ হতে পারেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা অসম্ভব। নিশ্চয়ই ওই ব্যক্তি প্রতারণা করছেন। তাকে খুঁজে বের করে এর জবাব চাওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে আমেরিকা থেকে এফআরসিএস করা ডা. মো. ইব্রাহীমের সঙ্গে যোগযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে, চিকিৎসকদের মধ্যে আমাদের বিধিবিধান মানতে না চাওয়ার প্রবণতা রয়েছে, বলেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএমডিসির এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণেই এসব অনিয়ম বন্ধ করা আমাদের জন্য কঠিন।’
আরও পড়ুন :
চাপে থাকলেও রামপাল নিয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সরকার
ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের অভিমত: সেদেশে অরণ্যের এত কাছে কিছুতেই অনুমতি পেতো না রামপালের মতো প্রকল্প
/টিএন/আপ-এসটি