প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই চলে গেলেন মুহিতুল

এএফএম মুহিতুল ইসলাম ( ফাইল ছবি)বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বাদী মুহিতুল ইসলামের শেষ ইচ্ছা ছিল বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেন তাকে একটু দেখতে যান। প্রধানমন্ত্রীও তাকে দেখতে যেতে চেয়েছিলেন। তার নির্দেশে মুহিতুলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল এবং উন্নত সিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তাকে দেখতে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার বাদী এএফএম মুহিতুল ইসলাম।
এ প্রসঙ্গে মুহিতুল ইসলামের ভাইয়ের ছেলে হাবিবুল ইসলাম পিটুল গত ১০ আগস্ট বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, ‘আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকেও আবেদন করেছি, প্রধানমন্ত্রী যদি তাকে এসে দেখে যেতেন।’
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (২৫ আগস্ট) বেলা ২টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মুহিতুল ইসলাম চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
এদিকে, হাসপাতাল চত্বরে মুহিতুল  ইসলামের একমাত্র কন্যা সানজিদা বিলকিস বাঁধনের আহাজারিতে চোখের কোণে পানি জমে উপস্থিত সবার।
বাঁধন বারবার তার স্বজনদের বলছিলেন, পাপা ছাড়া কার কাছে যাবো আমি, আমাকে পাপার কাছে নিয়ে চলো, আমার পাপা কই। শত চেষ্টা করেও তাকে শান্ত করতে পারছিলেন না কেউ। শ্বাসকষ্টের রোগী বাঁধন নিজেই এসময় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবুও কেউ তাকে বসাতে পারেননি। বারবার বাবাকে দেখতে চাইলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় লাশঘরে। ‘বাবাকে এভাবে কেন বেঁধে রাখছে’ বলেই লাশঘর থেকে বেরিয়ে চিৎকার করতে থাকেন  তিনি। তোমরা আমার বাবাকে ছেড়ে দাও, বাবার এভাবে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। আমার বাবা এভাবে ঘুমাতে পারে না, তার কষ্ট হবে, তোমরা তাকে আর কষ্ট দিও না -বলে আহাজারি করতে থাকেন মুহিতুল ইসলামের একমাত্র মেয়ে।
বাবা মতো বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করতেন চাচা, জানিয়ে হাবিবুল ইসলাম পিটুল বলেন, মামলার কারণে আমাদের পরিবারের ওপর অনেক হুমকি এসেছে। কিন্তু তিনি তো একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন, তাই কাউকে ভয় পাননি। ওনার শেষ ইচ্ছা ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় যাদের এখনও ফাঁসি হয়নি, যারা পলাতক আছেন তাদের এনে ফাঁসিতে ঝোলানো। এটা দেখে যেতে পারলে উনি শান্তি পেতেন- কথাটা সবসময়ে বলেছেন আমাদের। পিটুল বলেন, বঙ্গবন্ধুর রেসিডেন্ট পিএ ছিলেন তিনি। যখন হত্যাকাণ্ড ঘটে তখন নিজ চোখেই সবকিছু দেখেছেন। শেখ রাসেল তাকে ‘ভাইয়া’ বলে ডাকতো, বাড়ির ভেতরে বিকেলে ফুটবল খেলতেন দু’জনে। শেখ রাসেলকে ওনার বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মাথায় গুলি করেছিল ঘাতকরা, যেটা উনি কখনোই ভুলতে পারেননি। ওই সময়ে তারও পায়ে গুলি লেগেছিল। ওই সময়ের সবকিছু মিলিয়েই তার মানসিক সমস্যা তৈরি হয়। 

মুহিতুল ইসলামের নিরাপত্তারক্ষী শামসুল হক বলেন, অনেকদিন তার সঙ্গে থাকার ফলে আমাকে তিনি পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখতেন। ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আমি ওনার সঙ্গে আছি। আরেকজন নিরাপত্তারক্ষী থাকলেও আমিই তার বেশি দেখাশোনা করতাম।
বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মুহিতুল ইসলাম কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন। দু’টি কিডনিই ড্যামেজ ছিল তার। কিডনি হাসপাতালে তার নিয়মিত ডায়ালাইসিস হতো। গত ১২ জুলাই আবার অসুস্থ হলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন তিনি আইসিইউতে ছিলেন। অবস্থার একটু উন্নতি হলে কেবিনে নিয়ে আসা হয়। পরে আবার  বেশি  অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ২৭ জুলাই রাত থেকে তাকে আইসিইউতে লাইফ সার্পোট দেওয়া হয়। মঙ্গলবার তার অবস্থার অবনতি হয় খুব বেশি।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা নিয়ে কখনও কিছু বলতেন কিনা জানতে চাইলে শামসুল হক বলেন, বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহকারী মুহিতুল ইসলামের ওইদিন রাতে ডিউটি ছিল। যার কারণে তিনি সবকিছু দেখেছেন। পরে এ ঘটনায় তিনি মামলা করেন। তার মামলার ফলেই বঙ্গবন্ধুর কয়েকজন হত্যাকারীর ফাঁসি হয়। এগুলো তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন আমাদের।

রাসেলের কথাও বলতেন তিনি। বলতেন সেই শেষ সময়ের কথা। রাসেল তাকে বলেছিল, ‘ভাইয়া’ আমাকে মারবে নাতো?  তখন তিনি সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, ‘না ভাইয়া তোমাকে মারবে না’। তারপরও ঘাতকরা রাসেলকে মেরে ফেলেছে, এগুলো তাকে সবসময় মনোকষ্ট দিয়েছে- বলেন শামসুল হক।

১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা দায়ের করেন তার ব্যক্তিগত সহকারী এই মুহিতুল ইসলাম।

এদিকে,বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মুহিতুল ইসলামকে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের একজন বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মৃত্যুতে তিনি বলেছেন, একটি বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠজনকে হারালাম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তিনি। সে রাতে শেখ রাসেলকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ঘাতকরা রাসেলকে হত্যা করে। 

 আরও পড়তে পারেন: বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বাদী মুহিতুল ইসলাম আর নেই

/ জেএ/এমএসএম/