এক সময় দুর্ধর্ষ সব বন্দিদের সামলাতে প্রধান ফটকের গেটে অস্ত্রে সজ্জিত কারারক্ষী, পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতি ছিল। এমন একটি কারাগারের ফটকে এখন তালাই নেই। চিন্তামুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করছে কারারক্ষীরা। প্রথম দেখলে একটু অবিশ্বাস্যই মনে হবে।
প্রতিবেদকের সঙ্গে যে দু’জন কারারক্ষীর পরিচয় হয়েছিল তারা হলেন, ডেপুটি জেলার আশরাফুল আলম ও নজিবুল্লাহ। তাদের মধ্যে আশরাফুল আলমের সঙ্গে প্রধান ফটকের বাইরে দাঁড়িয়েই কথা হয়।
আশরাফুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি বর্তমানে কারাগারটির তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে রয়েছি। যেসব অসুস্থ বন্দি রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে তাও তিনি সমন্বয় করেন। এছাড়াও কারাবেকারি এখনও পুরান কারাগারের ভেতরে চালু রয়েছে। এসব বিষয় দেখভালের জন্য পুরনো কারাগারে এখনও অফিসিয়াল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সেলগুলো সব খালি। ধুয়ে মুছে রাখা হয়েছে। প্রতিদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে শেখ ফারুক নাম এক কারারক্ষীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদের ৪৩জন পরিচ্ছন্নতা কর্মীর মধ্যে আটজন চারনেতার জাদুঘর ও বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করেন। বাকি ৩৫ জন অপর সেল ও ভেতরের খোলা জায়গা পরিষ্কার করেন।’
তিনি দ্রুত কথা শেষ করে পকেট গেটটি বন্ধ করে দিলেন। এরপর কথা হয় প্রধান ফটকের ডানপাশের অনুসন্ধান কক্ষের বারান্দায় টেবিল পেতে বসা এক আনসার সদস্যের সঙ্গে। তিনি জানালেন, তারা ছয়জন কারাফটকে এখন ডিউটি করছেন। বাকিরা সামনে টহলে আছে।
তার সঙ্গে কথা চলার সময় দেখা গেল প্রধান কারাফটকের পকেট গেট দিয়ে একটি প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে একজন কারারক্ষী বের হয়ে পকেট গেটের সামনে বসলেন। তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি কোনও কথা বলতে রাজি হলেন না। সব বড় স্যারেরা জানেন বলে চুপ করে গেলেন। তারপর কারাগারের দেয়াল ধরে দেখা গেল, প্রতিটি ওয়াচ টাওয়ার খালি। সাক্ষাতের কক্ষে প্রবেশের দরজাটিতে তালা দিয়ে রাখা হয়েছে।
জেলখানার বিড়ালগুলোকে দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আগের বিড়ালগুলো ভালো ছিল। এখন কী অবস্থা দেখেন। আগে বন্দিরা ওদের দুধ খাওয়াতো, মাছ, ভাত দিত। এখানে শতাধিক বিড়াল ছিল। এখন নেই। সবগুলো চলে গেছে। কয়েকটি আছে।’
কারাফটকের সামনে লাল ইলেকট্রিক ঘড়িও চলছে আগের মতোই। ঘড়ির ঠিক ওপরে এখনও ঝুলছে ব্রিটিশ আমলের ঘণ্টাটি। তবে সুনশান নীরবতা। কারারক্ষীরা জানিয়েছেন, কারাগারে ডিউটি করতে এখন হঠাৎ হঠাৎ ভয় লাগে। রাতে ভেতরে কোনও লাইট জ্বালানো হয় না। ভেতরে কেউ রাতে যায়ও না।
কারারক্ষী সাত্তার মিয়া কারা বেকারির তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। বাইরের সাতজন কারিগর নিয়ে তিনি কারা বেকারিটি চালাচ্ছেন। পাউরুটি, কেক, টোস্টসহ ১৭ ধরনের বেকারি পণ্য তৈরি হয় সেখানে। প্রতিদিন সকালে কেরানীগঞ্জ নতুন কেন্দ্রীয় কারাগারে এই খাবার পাঠানো হয়। সেখানে বন্দিরা এই খাবার কিনে খেতে পারেন।
নাজিম উদ্দিন রোডের চায়ের দোকানদার রেজাউল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে শুধু পানি বিক্রি করতাম কয়েক হাজার টাকার। এখন সবকিছু বিক্রি করেও এক হাজার টাকা হয় না।’
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন জানান, ‘এখানে দু’টি জাদুঘর রয়েছে। এর একটি ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর,’ অপরটি ‘জাতীয় চার নেতার জাদুঘর’। এছাড়া, কারাগারের ভেতরের হাসপাতাল ভবনসহ আরও দু’একটি স্থাপনা থাকবে আদি রূপে। বাকি জায়গায় গড়ে উঠবে খোলা পার্ক, কৃত্রিম লেক, সুইমিং পুল, বহুতল গাড়ি পার্কিং, সিনেমা হলসহ মাল্টি কমপ্লেক্স। দেশের শ্রেষ্ঠ স্থপতিদের নকশায় এগুলো গড়ে তোলা হবে।’
কারাগারের সামনে তিনবছর ধরে হকারি করছে আলী মিয়া। তিনি বলেন, ‘আগে দিনে দুই হাজার বিক্রি করতাম। এখন ৫০০ টাকাও হয় না। শুনছি এই জায়গা পার্ক তৈরি করা হবে। তখন যদি আবার কিছু হয়। তবে তা দেরি হবে।’
পুরনো কারাগারের নানা পরিকল্পনা নিয়ে কথা হয় অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক ইকবাল হাসানের সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুরনো কারাগার নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। দেশের শ্রেষ্ঠ স্থাপতিদের কাছ থেকে নকশা আহ্বান করা হবে। তার মধ্যে থেকে বাছাই করে একটি গ্রহণ করা হবে। এজন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কয়েকটি বৈঠক করেছে। তারা কাজ করছে।’
/এআরআর/এসটি/এমএসএম/