কোরবানির মাংস ওরা খেয়েছে, তবে...





রাজধানীর বস্তি জুড়ে থাকা অধিকাংশ মানুষের ঈদ কেটেছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাংস চেয়ে নিয়ে খেয়েকোরবানির গরুর মাংস জুটেছে কোরবানিতে অসমর্থ সমাজের নিচতলার বাসিন্দা মানুষগুলোর পাতেও। তবে এর জন্যে বিস্তর হয়রানি ওদের পোহাতে হয়েছে। কথা বলতে গিয়ে এমনটাই অভিযোগ পাওয়া যায়।
তেজগাঁয়ের বেগুনবাড়ির পাশের বস্তিতে থাকে সুমি ও তার পরিবার। পরিবার বলতে বাবা মাসহ দুই ভাই ও দুই বোন। বাবা অন্ধ আর মা ভিক্ষে করে সংসার চালান। ১৩ বছরের সুমি বুধবার, ঈদের দ্বিতীয় দিনও ছোট ভাইকে নিয়ে বেরিয়েছে মাংসের খোঁজে। মগবাজার রেললাইনের পাশেই দেখা ওদের সঙ্গে। কথা বলতে চাইলে দুই ভাইবোন এসে দাঁড়ায় সামনে। দরিদ্রতা জেঁকে ধরে ওদের শরীর। উস্কোখুস্কো চুল, চেহারা মলিন, চামড়া ঠেলে বেরিয়ে এসেছে হাড়। হরেক রেসিপির ঈদ ওদের অজানা। চোখে আঙ্গুল দিয়ে যা দেখিয়ে দেয় ‘ঈশ্বর থাকেন ওই ভদ্রপল্লীতে।’
সুমি বলে, ‘আমরাতো গরিব মানুষ। গরিব বইল্যা এখানে আসতে হয়, টাকা নাই, টাকার অভাবে কোরবানিও দিতে পারি না। কিইন্যাও খাইতে পারি না। তয় কালকে দুপুরের পরে গোস্ত টোকাইতে বাইর হইছিলাম। সমর্থ নাই দেইখ্যা মাংস টোকাইতে আসি। কাল কাডলবাগান ঢাল (কাঁঠালবাগান ঢাল), বাংলামোটরে টোকাইছি। আইজও আসছি এখানে (ইস্কাটন)। তয় এখনও পাই নাই। হেরা কয়, আরও পরে দিবো, চারটার দিকে আইতে কইছে।’ মগবাজার রেললাইনের পাশের সড়কে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলেন সুমি।
ঈদে মাংস পেয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করতেই পাশ থেকে সাত বছরের আল আমিন জানায়, ‘পাইছি, মাইনষের কাছ থাইক্যা চাইয়া নিছি। পরে মায়ে রানছে, খাইছি।’
রাজধানীর বস্তি জুড়ে থাকা অধিকাংশ মানুষের ঈদ কেটেছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাংস চেয়ে নিয়ে খেয়েশুধু সুমি আর আল আমিনই নয়, রাজধানীর বস্তি জুড়ে থাকা অধিকাংশ মানুষের ঈদ কেটেছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাংস চেয়ে নিয়ে খেয়ে। আলমগীর সানি, শফিকুল, আল আমিন, ইব্রাহীম, স্মৃতি, হেলেনা, জাহিদ, রমজান, হাকিম, তরজিমা, আকতারা, সুমন, সুজনী সবাই এসেছে মাংস সংগ্রহে। তবে কথা বলতে ছবি তুলতে এদের আগ্রহের কোনও কমতি ছিল না। সবাই মিলে দাঁড়িয়ে কখনওবা দুষ্টুমি করতে করতেই ছবি তুললো তারা।
খালা খালুর সংসারে থাকেন ৯ বছরের ইব্রাহীম। বাবা-মা কোথায় জিজ্ঞেস করতেই তার উত্তর, বাবা মা মারা গেছে।খালু তার কাছে নিয়া আসছে।তার সঙ্গে কাচা তরকারি বেঁচি কারওয়ান বাজার রেললাইনের পাশে।বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে ইব্রাহীম বলে চলে, বাপের বাড়ি রংপুর আর মার বাড়ি ভোলা।বাপে পরিচয় দেয় নাইতো তাই বাপের বাড়ি চিনি না। মার লগে নানাবাড়িতেই থাকতাম, ওই বাড়িই চিনি। বছর গেলে কাপড় পাই না,কেউ আমাদের কিছু দিতে চায়না, ভালো সুবিধাগুলো পাই না। তাইতো আমরা এই রেললাইনের পাশের বস্তিতে থাকি।তাও মাঝে মাঝে ভাইঙ্গা দেয়।তারপর আবার বস্তি তুলি, সেখানে সবাই মিইল্যা থাকি।বাবা-মা তরকারি বেঁচে।তারাতো আর মাংস কিনতে পারে না।বছরে এই একবারই মাংস খাই, কোরবানির সময়ে যারা কোরবানি দেয় তাদের থিকে নিয়ে।কেউ দেয়, আবার কেউ দেয় না।ফ্রিজে ঢুকাইয়া থোয়, খারাপ ব্যবহারও করে কেউ কেউ। তবে সবাই এক না, অনেকেই আবার মাংস দেয়।তবে আগে মানুষ বেশি দিতো, এখন আর বেশি দেয় না কথাগুলো বেশ গুছিয়ে বলেন মোহাম্মদ সানি তেজকুনীপাড়ার কলোনীবাজার স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র সে।বাবা-মা, দাদা-দাদিসহ পরিবারের আটজনকে নিয়ে সানি থাকে বেগুনবাড়ি বস্তিতে।
রাজধানীর বস্তি জুড়ে থাকা অধিকাংশ মানুষের ঈদ কেটেছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাংস চেয়ে নিয়ে খেয়েতেজগাঁয়ের ইসলামীয়া স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আলমগীর বলে, কাল সারাদিন মাংস টোকাইছি, বাসায় গিয়া খাইছি। তবে সব বাসা থেকে মাংস দেয় নাই। দেড় কেজির মতো পাইছিলাম, তাই আজ আবার আইছি।যা পামু সব নিয়া বাসায় গিয়া মায়রে দিমু, মায় রানলে সবাই মিইল্যা খামু।এসময় পাশে দাড়ানো মুহকীমুল হাকিম নামের একজন বলেন, কোরবানীর যে মূলমন্ত্র সেটা যদি সবাই অনুসরণ করতো তাহলে এরাই হতো মাংসের মূল ভাগীদার। কিন্তু সেটা আমরা মনে রাখি না, মেনে চলি না। আর তাই এ ছোট ছোট শিশুগুলো মাংসের জন্য এ বাড়ি-ওবাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
/এইচকে/আপ-এবি