সন্ধ্যা সাতটা। রাজশাহী শহরের লক্ষ্মীপুর ভাটাপাড়া মোড়। মোড়ের চায়ের দোকানের পেছন থেকে মাদকের গন্ধে প্রশ্ন নিয়ে দোকানির দিকে তাকাতেই তিনি বলেন, ‘এলাকার ছেলে না।ওরা আশপাশ থেকে এসে খায়।’ রোজ আসে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসে, তবে রেললাইনের দিকে বেশি।’
রাত আটটা চল্লিশ। নগরীর মিশন হাসপাতাল রোডের পাশের রাস্তা। রাজপাড়া থানা থেকে ৫শ গজ দূরত্ব। অন্ধকারে কেনাবেচা হচ্ছে ফেন্সিডিল ও গাঁজা। একজনকে দেখে এগিয়ে গেলে তিনি বলেন, ‘আমি বিক্রি করছি না। তাহলে এখানে কী করছেন, প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘নিজে খাওয়ার জন্য রেখেছি।’ কোমরের লুঙ্গিতে বেল্ট দিয়ে বুলেট রাখার মতো সাজিয়ে ৫টা বোতল রাখা।ইয়াবা আছে কিনা প্রশ্নে এই বিক্রেতা বলেন, ‘ইয়াবা বিক্রি হয় আরেকটু ভেতরের দিকে, আর নদীর পাড়ে।’
রাজশাহীতে যেখানে-সেখানে মাদক বিক্রি ও সেবন দুই-ই বেড়েছে বলে মনে করছে প্রশাসন। এর মধ্যে ফেনসিডিল ও ইয়াবা সেবনের হার সবচেয়ে বেশি। তবে যে মাদক অভিযানের মাধ্যমে ধরা হয়, তার থেকে প্রায় বিশ গুণ বেশি মাদক বিক্রি হয়ে থাকে।এত বিক্রির বিপরীতে এত কম চালান ধরা পড়ার পেছনে পুলিশের গফিলতিকে দায়ী করছেন অভিভাবকরা। তারা বলছেন, পুলিশের চোখের সামনে, থানার আশেপাশেও মাদক বিক্রির স্পট আছে। কেউ দেখেও দেখে না। আর পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন এবং রাজশাহী এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত।
রাজশাহী জেলা পুলিশ চলতি বছরের জুলাই মাসে ১ হাজার ৫২০টি ও আগস্ট মাসে ১ হাজার ৫২৬টি ফেনসিডিলের বোতল উদ্ধার করেছে। এছাড়া জুলাই মাসে ২ হাজার ৫৪১ পিস ও আগস্ট মাসে ৬০৪ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে। আর চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে শহরে মাত্র ১ হাজার ৪৮ বোতল ফেনসিডিল ও ৫ হাজার ২০৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করলেও প্রতিদিন রাজশাহীতে হাজার বোতল ফেনসিডিল বিক্রি হয় বলে সরেজমিনে জানা গেছে।
রাজশাহী জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরীর দুটি উল্লেখ করার মতো স্পট হচ্ছে গুড়িপাড়া ও চামার পাড়া। তবে এখন নির্দিষ্ট স্পটের মধ্যে সামীবদ্ধ নেই মাদক ব্যবসায়ীরা। তারা ভ্রাম্যমান হয়ে মাদক কেনাবেচা করে’।
মাদকের মধ্যে ইয়াবার চালানটা কোনদিক দিয়ে আসে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে দুদিক থেকে আসার খবর পাই। একটি হচ্ছে মায়ানমার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে রাজশাহীতে প্রবেশ করে।আবার রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলের মাদকসেবীদের তথ্য মতে, ভারত থেকেও ইয়াবা আসে।’ ইয়াবার চালান কোনদিন থেকে আসে তা নিয়ে এখনও তারা রয়েছেন দ্বিধাদ্বন্দ্বে।
তিনি আরও বলেন, ‘১৮ থেকে ৩৫ বছরের ছেলেরা বেশি ইয়াবা ও ফেনসিডিলে আসক্ত। অনেকটা কৌতূহলবশত তারা মাদকের দিকে ধাবিত হয়েছে। এমনকি নিরাময় কেন্দ্রে ৭ম ও ৮ম শ্রেণির ছাত্রও পেয়েছি।’ তার পর্যবেক্ষণ বলছে, ‘যারা হেরোইনে বেশি আসক্ত ছিল,তারা ইয়াবার দিকে ঝুঁকেছে। কারণ হেরোইন খেলে মাদকসেবীরা ঝিমায়, আর ইয়াবা খেলে কর্মচাঞ্চল্য সাময়িক বৃদ্ধি পায়।’
সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও রাজশাহী পুলিশের মুখপাত্র ইফতে খায়ের আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাজশাহীতে বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, পুলিশসহ নানা সংস্থা আছে। তাদের সমন্বিতভাবে এসব ঠেকাতে কাজ করা জরুরি।’ পুলিশের কর্মকাণ্ড বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিগত কয়েকমাসে সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, আমাদের মামলার সংখ্যা অনেক বেড়েছে এবং এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা ধরা পড়েছে। আমাদের এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’
গত পাঁচবছর ধরে মাদকাসক্ত রবিনের বাবা সাবেক সরকারি কর্মকর্তা শফিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এত সহজে মাদক হাতে পৌঁছানোর ফলে তরুণসমাজ সহজেই এদিকে ঝুঁকে পড়ছে। আর উঠতি বয়সীদের জন্য রাজশাহীতে অবসর কাটানোর ভালো কোনও জায়গার অভাব রয়েছে। এই পরিবেশে এত মাদক পাড়ায়-মহল্লায় কীভাবে ঢুকে পড়লো, সে দায় পুলিশকেই নিতে হবে।’
মনোচিকিৎসক মোহাম্মদ আসিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুরুতে বেশ আগ্রহ নিয়ে কর্মচঞ্চলতা আছে ভেবে ইয়াবা সেবন করলেও পরবর্তীতে এক সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। তখন মৃত্যু ছাড়া তার সামনে কোনও পথ থাকে না। কীভাবে এই জায়গা থেকে বের করা যায় প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তরুণদের মধ্যে মাদকের কুফল সম্পর্কে খোলামেলা কথা বলা জরুরি। বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে বিভিন্ন সভার আয়োজন করতে হবে। আর কেন্দ্রকে সামাল দিতে গিয়ে, দেশের প্রান্তে বিশেষত সীমান্ত এলাকায় কী হচ্ছে সেদিকে নজর না দেওয়ায় ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।’
এপিএইচ/