জেএমবি এখন পশ্চিমবঙ্গেরও বিপদ, এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসেই ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এ সেটা লেখা হয়েছিল।তখন কলকাতার সদ্য পুলিশ কমিশনার হয়েছেন রাজীব কুমার। ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এর প্রতিবেদন বলেছিল, ‘ওই আইপিএস অফিসার এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসা মানে বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের সমূহ বিপদ, তিনি বেছে বেছে সে দেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’-দের ধরতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করবেন, যে কাজে তিনি সিদ্ধহস্ত।’
সাত মাসের মধ্যে দেখা গেল, বাংলাদেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ জঙ্গিদের অন্যতম, আনোয়ার হোসেন ফারুক ওরফে জামাই ফারুককে গ্রেফতার করলো কলকাতা পুলিশ এবং সঙ্গে আরও দুই বাংলাদেশি নাগরিককে, যারা সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। ধরা পড়েছে খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলায় অভিযুক্ত আরও তিন জন। তাদের কাছ থেকে বিস্ফোরক, ডেটোনেটর, ব্যাটারি ও তার পাওয়া গেছে।
কিন্তু ফারুকদের এই গ্রেফতারি ও তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্য ইঙ্গিত করছে, ভারতের মাটিতে জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) এখনও ফুরিয়ে যায়নি। কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (স্পেশাল টাস্ক ফোর্স) বিশাল গর্গ বলেন, ‘‘ভারতের দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে জেএমবি-র জঙ্গিরা নাশকতা ঘটানোর চেষ্টা করছিল। পশ্চিমবঙ্গকে তারা ব্যবহার করছিল ট্রানজিট রুট ও ক্যাম্প হিসেবে।’’
খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলার চার্জশিটে ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) আদালতে যে তথ্য দিয়েছে, তাতে কিন্তু ভারতের কোথাও জেএমবি-র হামলা ঘটানোর কোনও পরিকল্পনার কথা বলা নেই। সেখানে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার জন্য সে দেশে ধারাবাহিক নাশকতা ঘটানোর লক্ষ্যে জেএমবি প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং সেই কাজে তারা ব্যবহার করছিল পশ্চিমবঙ্গের মাটিকে। আর ফারুক ও তার সহযোগিরা ধরা পড়ার পর জানা যাচ্ছে, ভারতও জেএমবি-র আঘাত হানার লক্ষ্য। যেটা নতুন উদ্বেগের কারণ বলে জানাচ্ছেন গোয়েন্দা বিভাগের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা।
কলকাতা পুলিশের সন্ত্রাসবাদ দমন শাখার এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘‘খাগড়াগড় ঘটনার পরেও জেএমবি দমেনি। পশ্চিমবঙ্গে তারা এখনও তৎপর রয়েছে। ট্রানজিট রুট ও ক্যাম্প হিসেবে তারা দিব্যি এই রাজ্যকে, বিশেষ করে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাংলাদেশ সীমান্ত ও সন্নিহিত এলাকাগুলোকে ব্যবহার করছিল। ওইসব এলাকা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা আর হাওড়া জেলা থেকে নতুন নতুন ক্যাডারও রিক্রুট করেছিল খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পরে, যেহেতু বর্ধমান, বীরভূম, নদিয়া, মুর্শিদাবাদে তাদের সংগঠন কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যেকোনও সময়েই তারা নাশকতা ঘটানোর পরিকল্পনা নিতে পারে।’’
তদন্তকারীদের সন্দেহ, আড়াই বছর আগে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে, পুলিশ খুন করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া ফারুক কোনও ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা করছিল, আর সেটা জানাই এখন তাদের লক্ষ্য।
কলকাতার এনআইএ আদালতে খাগড়াগড় মামলার বিচার শুরু হয়েছে গত ২০ অগস্ট। যেদিন সকালে জামাই ফারুক, জবিরুল ইসলাম ও রুবেল মিয়া নামে তিন বাংলাদেশি নাগরিক-সহ ছ’জনকে গ্রেফতারের কথা কলকাতা পুলিশ ঘোষণা করল, সেই ২৬ সেপ্টেম্বর সকালেও মামলার শুনানি ছিল। আটক ছ’জনের মধ্যে ফারুক বাদে সকলেই খাগড়াগড় মামলায় ‘ওয়ান্টেড’। এর পরেও খাগড়াগড় মামলায় অভিযুক্ত ন’জন অধরা থাকলো।
এত জন অভিযুক্তের পলাতক থাকা নিয়ে এনআইএ কিছুটা যেন নিশ্চিন্তই ছিল। জিজ্ঞেস করলে এনআইএ-র একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা বলতেন, ‘‘ঘটনাচক্রে এরা ধরা পড়েনি, এ-ই যা। কিন্তু সবাই তো পালিয়ে বেড়াচ্ছে। যেকোনও সময়ে ধরা পড়ে যাবে। এ দেশে হামলা ঘটানোর শক্তি আর ওদের নেই।’’ তা ছাড়া, খাগড়াগড় বিস্ফোরণের কিছু দিনের মধ্যেই বাংলাদেশের পুলিশ ও গোয়েন্দারা সেদেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’-দের যে তালিকা এনআইএ-কে দেন, তাতে ফারুকের নাম ছিল। অথচ গত প্রায় দু’বছরে এ দেশে ফারুকের গতিবিধি ও কার্যকলাপ সম্পর্কে এনআইএ-র কাছে কোনও তথ্যই ছিল না।
তবে জামাই ফারুকের গ্রেফতারের পর এনআইএ স্বীকার করে নিচ্ছে, জেএমবি সম্পর্কে তাদের খবর ও মূল্যায়ণ এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে কিছু ফারাক থেকে গিয়েছিল।
এপিএইচ/
আরও পড়ুন: