ফিরে আসা দুই যুবকের উপলব্ধি: জঙ্গিবাদ হচ্ছে অন্ধকার পথ

14551036_1240250246016967_1339923064_o

জঙ্গিবাদ হচ্ছে অন্ধকার পথ। শুরুতে ধর্মের দোহাই দিয়ে আকৃষ্ট করলেও এই পথ সবাইকে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এ জীবনের কোনও লক্ষ্য নেই। তাই জঙ্গিবাদে দীক্ষা নিয়েও বিষয়টি বুঝতে পেরে আমরা ওই পথ থেকে সরে এসেছি। স্বাভাবিক জীবনযাপন করার সুযোগ চেয়ে র‌্যাবের কাছে সবকিছু খুলে বলে আত্মসমর্পণ করেছি। বাংলা ট্রিবিউনের কাছে এই উপলব্ধির কথা খুলে বলেছেন জঙ্গিপথ থেকে ফিরে আসা দুই যুবক আব্দুল হাকিম ও মাহমুদ।

বুধবার বগুড়ার শহীদ স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত জঙ্গিবাদবিরোধী সুধী সমাবেশে তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

র‌্যাব-১২ এর সিও শাহাবুদ্দিন খানের সভাপতিত্বে ওই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ।

আত্মসমর্পণ করা দুই জঙ্গির একজন আব্দুল হাকিম জানায়, তার বাড়ি বগুড়ার শাজাহানপুরের কামারপাড়ায়। তার বাবার নাম আব্দুর রহমান। সে মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেছে। গুলশান হামলায় নিহত খায়রুল ইসলাম পায়েল তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহপাঠী ছিল।

হাকিম বলেছে, সে আর পায়েল একসঙ্গে চলাফেরা করতো। এক পর্যায়ে পায়েলের মাধ্যমে সে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমান শাসন ব্যবস্থার অনেক কিছু তার পছন্দ হতো না। তাই দেশে ইসলাম কায়েম করার জন্য সে জিহাদের রাস্তা বেছে নিয়েছিল।

সে জানিয়েছে, বন্ধু পায়েল ঢাকার মিরপুরের একটি জঙ্গি আস্তানায় তাকে রাখে। সেখানে খায়রুল ও অন্যদের সঙ্গে শারীরিক কসরত ও অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। সেসময় তাদের কথিত বড় ভাইয়েরা জিহাদসহ নানা বিষয়ে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতো।

হাকিম আরও জানিয়েছে, মিরপুরের জঙ্গি আস্তানায় নতুন যারা ছিল তাদেরকে একটি আলাদা রুমে রাখা হতো। আর অন্য একটি রুমে মাঝে মাঝে কথিত বড় ভাইয়েরা আসতো। একদিন সে উঁকি দিয়ে দেখে ওই রুমে ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ফটোকপি মেশিন দিয়ে তারা কাজ করছে।

হাকিম জানায়, গুলশান হামলায় সে যায়নি। পরে  মিডিয়ার মাধ্যমে গুলশান ও শোলাকিয়া হামালার ঘটনা সে জেনেছে। এরপর সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জঙ্গিবিরোধী বিশেষ তৎপরতা শুরু হলে সে জঙ্গি আস্তানা থেকে পালিয়ে আসে। তারপর একপর্যায়ে সে উপলব্ধি করে যে রাস্তায় সে রয়েছে সেটি সঠিক পথ নয়।এটি একটি অন্ধকার পথ।এ জীবনের কোনও লক্ষ্য নেই। পরে সে পরিবারের সদস্যকে সমস্ত ব্যাপার খুলে বললে পরিবারের সদস্যরা তাকে বগুড়ার র‌্যাব-১২ ক্যাম্পে এনে আত্মসমর্পণ করায়।

সবশেষে আব্দুল হাকিম বলে, অপরাধকে ঘৃণা করবেন, অপরাধীকে নয়। আমি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চাই। আমাকে ক্ষমা করবেন।

যারা জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িত রয়েছে তাদের সম্পর্কে হাকিম বলে, ‘যারা এ পথে গিয়েছো সেখান থেকে ফিরে আসো। ভালো করে উপলব্ধি করলে বুঝতে পারবে যে এটা অন্ধকার পথ।

আরেক আত্মসমর্পণকারী মাহমুদুল হাসান বিজয় জানিয়েছে, তার বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটা থানায়। তার বাবা  নাম মৃত সেকান্দার আলী। সে প্রথমে  মাদ্রাসায় পড়তো। হাফেজ হওয়ার উদ্দেশ্যে কোরান শরীফের ১০ পারা মুখস্থ করে সে। পরে  অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। এরপর থেকে সে ছাত্র শিবিরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

বিজয় জানায়, ২০১৪ সালে সে এসএসসি পাস করে বগুড়ায় এসে পলিটেকনিকে ভর্তি হয়।  সেখানে পড়া অবস্থায় শায়খ জসিম উদ্দিন রাহমানির কিছু বই ও অনলাইনে লেকচার পড়ে সে জিহাদের পথে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়। এসময় তার সঙ্গে কথিত বড় ভাইদের পরিচয় হয়। তারা তাকে বলেছিল, জিহাদ হলো জান্নাতে যাওয়ার একমাত্র পথ। তাদের সঙ্গে সে ভিপিএন এবং থ্রিমা অ্যাপ দিয়ে যোগাযোগ করতো।

বিজয় আরও জানায়, বগুড়া থেকে সে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেয়। পরে অস্ত্রের প্রশিক্ষণের জন্য তার ডাক পড়ে। তখন তার প্রশিক্ষক বলে এ লাইনে থাকতে হলে বাবা-মা সবাইকে ছেড়ে আসতে হবে এবং ১০ হাজার টাকা সঙ্গে রাখতে হবে।

বিজয় জানায়, সে বাসা থেকে টাকা জোগাড় করতে পারছিল না। এরই মধ্যে গুলশান ও শোলাকিয়া ঘটনা ঘটে যাওয়ার কারণে সারাদেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জঙ্গিবিরোধী বিশেষ তৎপরতা শুরু হয়। জঙ্গিরা মারা যাওয়ার কারণে সে খুব ভীত হয়ে পড়ে। সে পুরো বিষয়টি পরিবারকে জানায়। তার পরিবার পরে তাকে ক্যাম্পে নিয়ে আত্মসমর্পণ করায়।

বিজয় বলে, আমি সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি না জেনে ভুল পথে গিয়েছিলাম। ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল।

এদিকে র‌্যাবের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল তাদের হাতে পুনর্বাসনের জন্য ৫ লাখ করে দুটি চেক তুলে দেয়।

তবে র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, আত্মসমর্পণ করলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে এখনও তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়নি। সুবিধাজনক সময়ে তাদের পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হবে।  

/এআর/টিএন/