জঙ্গিরা মাদক নেয়নি, ছিল ঠাণ্ডা মাথার খুনি

গুলশান হামলার পাঁচ জঙ্গি

গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিরা ছিল ঠাণ্ডা মাথার খুনি। ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে তারা ঠাণ্ডা মাথায় নৃশংস কায়দায় কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছিল। পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) ও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) ফরেনসিক প্রতিবেদনেও এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

গুলশান হামলাসহ বিভিন্ন জঙ্গি হামলার ঘটনা তদন্তে নিয়োজিত কর্মকর্তারা জানান, গুলশান হামলার পর এপর্যন্ত অন্তত ৩২ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। এরমধ্যে ২০ জনের ডিএনএ ও ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী জঙ্গিরা হামলায় অংশ নেওয়ার সময়, কিংবা তার আগে কোনও মাদক গ্রহণ করেনি। ঠাণ্ডা মাথায় পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তারা প্রস্তুতি নিয়ে হামলায় অংশ নেয়। বীভৎস প্রক্রিয়ায় হামলা চালিয়ে তারা বিদেশিসহ সাধারণ নারী-পুরষকে হত্যা করে।

গত ১ জুলাই হলি আর্টিজান বেকারি ও রেস্টুরেন্টে অপারেশন থান্ডার বোল্টে নিহত পাঁচ জঙ্গিও হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটানোর আগে কোনও মাদক গ্রহণ করেনি। ওইসব জঙ্গিদের ময়নাতদন্তকারী ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘গুলশানের ওই রেস্টুরেন্টে বিদেশিদের বেশিরভাগের মৃত্যু হয়েছে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে। তাদের সাত জনের শরীর থেকে বুলেট বের করা হয়েছে। তাদের মাথায় ও ঘাড়ে ধারালো অস্ত্রের কোপ ছিল।’

গুলশান হামলা

তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গিদের নৃশংস ও বীভৎসতার মাত্রা দেখে সবার মনেই সন্দেহ হয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের মতো তারাও হামলা ও হত্যাকাণ্ডের আগে কোনও মাদক গ্রহণ করেছিল কিনা। এরপরই দেশের তদন্ত সংস্থা সিআইডি ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই তাদের ফরেনসিক ল্যাবে জঙ্গিদের ডিএনএসহ শরীরের রক্ত ও বিভিন্ন অংশের পরীক্ষা করে। এসব পরীক্ষা-নীরিক্ষায় ফলাফলে দেখা যায়, তারা কোনও মাদক না নিয়েই ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে।

সিআইডি’র ফরেনসিক বিভাগের কর্মকর্তারাও জানান, হামলার আগে জঙ্গিরা মাদকজাতীয় কোনও দ্রব্য গ্রহণ করেনি বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ঠাণ্ডা মাথায় জঙ্গিরা হলি আর্টিজানে ১৭ বিদেশিসহ ২০ নারী-পুরুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সিআইডি’র রাসায়নিক পরীক্ষাগারের প্রধান ড. দিলীপ কুমার ঘোষ এর আগে সাংবাদিকদের বলেছেন, গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার ঘটনায় এবং কল্যাণপুর ও নারায়ণগঞ্জের আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত ২০ জঙ্গির ভিসেরা পরীক্ষার জন্য নমুনা বা আলামত হিসেবে তাদের স্টমাক, লিভার, কিডনি ও রক্ত পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় তাদের কারও দেহে ক্যাপ্টাগন, ইয়াবা কিংবা অন্য কোনও ধরনের মাদক গ্রহণের প্রমাণ তারা পাননি।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গিদের নৃশংসতা ছিল গা শিউরে ওঠার মতো। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও তারা অনেককে দীর্ঘ সময় নিয়ে কুপিয়েছে। এসব আলামত দেখে তারা প্রথমে মনে করেছিলেন কোনও সুস্থ মানুষ এমন নৃশংস হতে পারে না। কিন্তু ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা- নিরীক্ষার পর তারা নিশ্চিত হন জঙ্গিরা কোনও মাদক না নিয়েই ঠাণ্ডা মাথায় এমন বীভৎস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে।’ সোহেল মাহমুদ আরও বলেন, ‘ময়নাতদন্তে দেখতে পেয়েছি নারীদের ওপর বেশি নৃশংস ছিল হামলাকারীরা। তাদের বুকে, পেটে, হাতে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে বেশি।’

/জেইউ/এপিএইচ/