গাজীপুরের পাতারটেকে পুলিশের অভিযানে নিহত জঙ্গি ইব্রাহিমের লাশ নিতে চায় তার পরিবার। নিহতের ভাই মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরা ইব্রাহিমের লাশ আনতে চাই। লাশ আনার প্রসেস করতে জয়দেবপুর থানায় গেছে আমার বাবা, চাচা, চাচাতো ভাই।লাশ কখন দেয় সেটা প্রশাসন জানে।’
মঙ্গলবার বকশিবাজার এলাকার পুরনো মোঘলটুলিতে চামড়ার মার্কেটের পাশে ৬ তলা বাড়ির তৃতীয় তলার দরজায় নক করতেই বেরিয়ে আসেন ইব্রাহিমের ভাই মোহাম্মদ। বাসায় আত্বীয়-স্বজন অনেকে আছেন। সবার মানসিক অবস্থা ভাল না জানিয়ে কথা বলার জন্য নিচে আসেন। বাসার নিচেই একটি চামড়ার দোকানে বসে বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
মোহাম্মদ বলেন, ‘আমার ভাই কিভাবে যে এই উগ্রবাদে জড়াইছে, আমরা কিছুই টের পাইনি। ছোটবেলা থেকে সে আমাদের সবাইকে ডেকে তুলে ফজরের নামাজে নিয়ে যেতো। ৮ আগস্ট রাতেও সে সবার আগে ঘুম থেকে ওঠে। কিন্তু কাউকে ডাক না দিয়েই বেরিয়ে যায়। আমাদের এখানে ফজরের জামাত হয় পৌনে ৫ টায়। ও আনুমানিক সোয়া ৪টার দিকে ওঠে ৪টা ২০ মিনিটে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘পড়াশুনা কম করলেও ছাত্র ভালো ছিল ইব্রাহিম। গাজীপুরের তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষা দিয়েছিল সে। আলিমে তার রেজাল্ট ছিল জিপিএ ৪.৮০। কিন্তু ফল প্রকাশ হওয়ার আগেই সে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, জড়িয়ে পড়ে জঙ্গিবাদে।’
বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগের রাতে বাবার সঙ্গে রাগারাগি হয় বলে জানান নয় ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘ইব্রাহিম পড়াশুনা বাদ দিয়ে সারাদিন-রাত মোবাইল নিয়ে থাকতো। এনিয়ে বাবা আগের দিন বকাঝকা করেন। পরদিন ভোর থেকে ও নিখোঁজ। আমরা ভেবেছিলাম, বাবার সঙ্গে রাগ করে চলে গেছে। রাগ কমলে আবার ফিরে আসবে। কিন্তু জঙ্গি হয়ে যে লাশ হিসেবে ফিরবে এটা বুঝতে পারিনি।’
নয় ভাইবোনের মধ্যে ইব্রাহিম ষষ্ঠ। আর ভাইদের সে মধ্যে তৃতীয়। সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকা ছাড়া ইব্রাহিমের আর কোনও পরিবর্তন পরিবারের কারও চোখে পড়েনি। বন্ধু বা আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গেও কম মিশতো সে। যেন মোবাইল ছিল তার সবকিছু। একটা ছেলে মোবাইলে কি করে সেটা কারও বুঝার উপায় ছিল না। এছাড়া তার আর কোনও পরিবর্তন দেখতে পাননি বলে জানান, ইব্রাহিমের বোনের স্বামী আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সে অনেকটা চুপচাপ থাকতো। কারও সঙ্গে খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কথা বলতো না। কিন্তু কিভাবে যে কি হলো তা বুঝতে পারছি না। কেমনে সে এই ভুল পথে পা বাড়ালো?’
নিখোঁজের পরদিন ৯ আগস্ট ইব্রাহিমের পরিবারের পক্ষ থেকে বংশাল থানায় মিসিং জিডি করা হয়। সঙ্গে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট, র্যাব, এসবি’র বিশেষ শাখায় নিখোঁজের বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়। গাজীপুরের পাতারটেকে সিটিটিসি’র অভিযানে ইব্রাহিমসহ ৭ জঙ্গি নিহতের পর গতকাল ১০ অক্টোবর পরিবারকে সিটিটিসি ডেকে পাঠায়। পরে তার বাবা আজিম উদ্দিন ছবি দেখে নিজের ছেলে বলে ইব্রাহিমকে শনাক্ত করেন।
এব্যাপারে ইব্রাহিমের বড় ভাই মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরা আগেই পুলিশের ফেসবুকে ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করি। আঠারো বছর ধরে দেখছি। ওকে চিনবো না! পরে পুলিশের সিটিটিসি থেকে ডেকে পাঠালে বাবা ছবি দেখে লাশ শনাক্ত করে আসেন। কিন্তু লাশ দেখতে দেওয়া হয়নি। পরে শুনলাম লাশ গাজীপুরে আছে। রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। এখন শুনছি কুর্মিটোলা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।’
ইব্রাহিমের বাবা আজিম উদ্দিন ছেলের লাশ আনার প্রসেস করতে গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় গেছেন বলে জানান মোহাম্মদ। মঙ্গলবার সকাল ১১টায় জয়দেবপুর থানায় যান তিনি। বিকেল ৪টা পর্যন্ত জানা যায়, তিনি তখনও জয়দেবপুর রয়েছেন।
লাশ নেওয়ার ব্যাপারে মোহাম্মদ বলেন, ‘আমার ভাইয়ের লাশ আমরা নিতে চাই। এজন্য আমরা যোগাযোগ করছি। এখন প্রশাসন কখন দেবে সেটা তাদের ওপর নির্ভর করছে।’
উল্লেখ্য, গত ৮ আগস্ট গাজীপুরের নোয়াগাঁও পাতারটেক এলাকায় সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। এতে নব্য জেএমবির ঢাকা বিভাগের কমান্ডার ফরিদুল ইসলাম আকাশ, সিলেটের ছাতকের সাইফুল ইসলাম ও ইব্রাহিমসহ সাত জঙ্গি নিহত হয়। সিটিটিসির পরিচালিত অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন শরতের তুফান’।
১০ অক্টোবর রাতে গাজীপুর থেকে তিনটি অ্যাম্বুলেন্সে করে নিহত মোট ৯ জঙ্গির লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আনা হয়। এরপর এগুলো কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয।
আরজে/ এপিএইচ/