ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পড়ানোর শিক্ষক নেই

এসব শিশুরা মাতৃভাষায় বই পাবে, কিন্তু তা পড়ানোর শিক্ষক নেই

সরকারের দীর্ঘ পরিকল্পনার পর পাঁচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা মাতৃভাষায় রচিত পাঠ্যবই পেতে যাচ্ছে। আগামী বছরের প্রথম দিনই প্রথমবারের মতো তাদের হাতে বই তুলে দেওয়া হবে। এর উদ্দেশ্য, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা টিকিয়ে রাখা। একইসঙ্গে তাদের মধ্যে সাক্ষরতার হারও বাড়ানো। অথচ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ রয়েছে, নিজস্ব ভাষায় এসব বই পড়ানোর জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কোনও দক্ষ শিক্ষক নেই। তারা বলছেন, এর ফলে শিশুরা বিনামূল্যে বই পেলেও হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করা কিংবা টেবিলে-তাকে সাজিয়ে রাখা ছাড়া কোনও কাজ নেই তাদের।

জানা গেছে, দেশে সরকারি হিসাবে ৩৭টি এবং বেসরকারি হিসাবে ৪৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সব নৃগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা। কিন্তু তাদের নিজস্ব ভাষায় সরকারিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল না। এ কারণে এসব শিশু বাধ্য হয়েই বাংলা ভাষায় শিক্ষা নেয়। এর ফলে তাদের মাতৃভাষা দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর সরকার আগামী শিক্ষাবর্ষে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রী—পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রাক-প্রাথমিকের শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) এসব বইয়ের পাণ্ডুলিপি ও ছাপার কাজ চলছে।

এনসিটিবি ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এনসিটিতে বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ৫১ হাজার ৭৮২টি বই ছাপানো হচ্ছে। ১ জানুয়ারি বিনামূল্যের এসব বই শিশুদের মাঝে বিতরণ করা হবে।

আগামী বছর শুধু প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় বই দেওয়া হবে। পরের বছর (২০১৮) প্রথম শ্রেণি ও এর পরের বছর দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বইও মাতৃভাষায় ছাপিয়ে বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। তবে এরপর ধীরে-ধীরে সবাইকে জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী বই পড়তে হবে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ সিকদার বলেন, ‘এর জন্য আমরা অনেক দিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম। এটা হলে খুবই ভালো হবে। তবে শুধু বই হলেই মাতৃভাষায় শিক্ষা হয়ে যাবে, এমনটা নয়। এখনও শিক্ষক প্রশিক্ষণ হয়নি। সেটা না হওয়া পর্যন্ত এটা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যাবে।’

আর এসব বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে এনসিটিবিকে সহযোগিতা করছে প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর পাঁচজন করে মোট ৩০ জন। প্রতিটি গ্রুপ তদারকি করছেন এনসিটিবির পাঁচজন কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ।

এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘চাকমা ভাষার বইয়ের চিত্রগুলো করার কাজে যুক্ত ছিলেন শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। মারমা ভাষার বই লেখার কাজ সমন্বয় ও সম্পাদনা কমিটির প্রধান খাগড়াছড়ির মহালছড়ির পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল কর্মকর্তা অংক্যজাই মারমা।’

এনসিটিবিতে চাকমা ভাষার পাণ্ডুলিপি তৈরির দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রাপ্ত এক শিক্ষক বলেন, ‘চাকমাদের নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা রয়েছে। কিন্তু চাকমা ভাষা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষারও সুযোগ নেই। ফলে চাকমা ভাষা বাংলায় লিখতে গিয়ে ভুল হয় এবং শব্দ বিকৃতভাবে প্রকাশিত হয়। সরকারের এ উদ্যোগের কারণে চাকমারা মাতৃভাষায় লেখাপড়ার মাধ্যমে নিজেদের ভাষা শেখার সুযোগ পাবে।’

এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অর্ধ-লক্ষাধিক শিশুকে মাতৃভাষায় পাঠদান নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনও পরিকল্পনা নেই। সব এলাকায় পাঁচটি নৃগোষ্ঠীর পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। স্বল্পসংখ্যক শিক্ষক থাকলেও অনেকের উচ্চারণ নিয়ে সমস্যা রয়েছে। এ ছাড়া তিন পার্বত্য জেলায় শিক্ষক নিয়োগ ও বদলি নিয়ন্ত্রণ করে পার্বত্য জেলা পরিষদ। ফলে শিশুরা মাতৃভাষার বই পেলেও পাঠদান নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘যেসব স্কুলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা ভর্তি হবে, সেখানে ওই নৃগোষ্ঠীর শিক্ষক না থাকলে অন্যত্র থেকে বদলি করে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হবে।’ প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও পাঠদানের জন্য কোনও পরিকল্পনা রয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনও তথ্য জানাতে পারেননি।

এনসিটিবির কারিকুলাম বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষা সঠিক উচ্চারণের মাধ্যমে শিক্ষা না দিলে আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। সঠিকভাবে পাঠদান করা হচ্ছে কিনা—এজন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। এ ছাড়া সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদানের জন্য উপযোগিতা যাছাই করে পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা তৈরির পরামর্শ দেন তারা। পাঠদানের জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক তো অবশ্যই দরকার রয়েছে।

তবে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ বা এনজিওদের দায়িত্ব দিয়ে সমস্যার সমধান সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘শুধু বই ছাপালেই তো হবে না, শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া বাঞ্ছনীয়। আপাতত শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে হলেও শিক্ষক নেওয়া যেতে পারে। তবে সরকারকেই পাঠদানের দায়িত্ব নিতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। বেশ কিছু এনজিও ইতোমধ্যেই কাজ করছে, তাদের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।’

উল্লেখ্য, সিরাজগঞ্জ, হবিগঞ্জের বাহুবল, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা ও কুলাউড়া, রংপুরের পীরগঞ্জ, বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, জামালপুরের বকশিগঞ্জ, শেরপুরের শ্রীবর্দী, নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলাসহ রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। পর্যায়ক্রমে অন্য নৃগোষ্ঠীর শিশুদেরও মাতৃভাষায় বই দেওয়া হবে।

/এমএনএইচ/