সিল্ক রুটের হাতছানি

ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ম্যাপ

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর বাংলাদেশ সফরে আলোচনার অন্যতম বিষয় হবে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’। আর এই বৃহত্তম কানেকটিভিটির উদ্যোগে চীন ও বাংলাদেশসহ ৩০টির বেশি দেশ যোগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে এশিয়ার মধ্য দিয়ে চীনের সঙ্গে ইউরোপের যোগাযোগ স্থাপন করা হবে। আর বাংলাদেশ হবে এই সিল্ক রুটের কেন্দ্র। ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ আর কিছুই নয়, এটি হচ্ছে প্রাচীন সিল্ক রুট, যা নিয়ে আলোচনা চলছে বছরের পর বছর ধরে।

অর্থনৈতিক শক্তি বজায় রাখতে যতগুলো বাণিজ্যিক যোগাযোগ সুবিধা থাকা দরকার, তার সবটুকু কাজে লাগাতে চায় বেইজিং। এজন্য চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রস্তাবনাটি কৌশলগত  কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ উদ্যোগ নতুন কোনও বিষয় নয়। প্রাচীনকালে চীনের ব্যবসায়ীরা এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে ‘সিল্ক রুট’ দিয়ে ব্যবসা করতেন এবং মূলত তারই পুনরুত্থান হচ্ছে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রস্তাবিত ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’।

চীনে খ্রিস্টপূর্ব ২০০ সালে হান সাম্রাজ্যের সময়ে সিল্ক রুট নামের এই বাণিজ্য পথটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এপথ দিয়ে শুধু চীনা ব্যবসায়ীরাই নয়, আরব, তুরস্ক, ভারত, ইরান, গ্রিক, সিরিয়া, জর্জিয়া, আর্মেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, আরব, ইউরোপ ও আফ্রিকাতে বাণিজ্য করতেন।

এরুটের নাম সিল্ক রুট হওয়ার কারণ হচ্ছে, এপথে চীনের উৎকৃষ্টমানের সিল্ক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো। শি জিনপিং এর প্রস্তাবিত ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড এর উদ্যোগ মূলত সিল্ক রুটের পুনরুত্থান।

প্রাচীন সিল্ক রুট ম্যাপ

২০১৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কাজাখস্থানে এক ভাষণে তার ভিশনারি ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ উদ্যোগের বিষয় প্রথম জানান।পরবর্তী তিন বছরে এটি ডালপালা বিস্তৃতি লাভ করে এবং বাংলাদেশসহ ৩০টির বেশি রাষ্ট্র এ উদ্যোগে যোগ দিয়েছে।

প্রস্তাবিত এরুটের মাধ্যমে স্থলপথে এশিয়ার মধ্য দিয়ে চীনের সঙ্গে  ইউরোপের যোগাযোগ স্থাপন করা হবে। আবার সুমদ্রপথে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সঙ্গে চীনের যোগাযোগ স্থাপন করা হবে, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগের মাধ্যমে।

প্রস্তাবিত এরুটটি কার্যকর করতে হলে খরচ হবে হাজার হাজার কোটি ডলার এবং এর সিংহভাগ চীন বহন করতে আগ্রহী। কিন্ত প্রশ্ন হচ্ছে, কেন চীন এত অর্থ খরচ করে এ রুটটি করতে চায়। কারণ, চীন বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ২০১৪ সালে চীনের রফতানি ছিল ২.৩৪ ট্রিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ছিল প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার।

ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড এর মাধ্যমে চীন অনেকগুলো রাস্তা করতে চায়, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত যেকোনও পরিস্থিতি, যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ-বিগ্রহ বা অবরোধের মধ্যেও যেন সুযোগ থাকে ভিন্ন পথে বাণিজ্য যোগাযোগ অব্যাহত রাখা।

চীন অনেকগুলো কৌশলগত পণ্য আমদানি করে থাকে, যেমন- তেল, লোহা, খনিজ পদার্থ ও খাদ্যদ্রব্য। বেইজিং এ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে চায়। আবার রফতানির জন্যও রুটটি  নিরাপদ রাখতে চায়।

চীনা সিল্ক

চীনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বেইজিংয়ে সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময়ে চীনের প্রস্তাবিত রোড ও বেল্ট উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য বেশ কিছু  চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে।এ চুক্তিগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন।’

চীনের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী কং জুয়ানইউ বলেন ‘বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চীনের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এ সফর বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্কের একটি মাইলফলক।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফায়েজ আহমেদ বলেন, ‘রোড ও বেল্ট উদ্যোগ একটি ধারণা। যেকোনও দেশ এখানে যোগ দিতে পারে। রোড ও বেল্ট উদ্যোগের  উদ্দেশ্য হচ্ছে বাণিজ্য করার পথ বা রুট নিরবচ্ছিন্ন রাখা।’

ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত লিয়াকত আলী চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ রোড ও বেল্ট উদ্যোগকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করে।’

উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের আমন্ত্রণে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কম্বোডিয়া থেকে আগামী ১৪ অক্টোবর দু’দিনের মাইলফলক সফরে ঢাকা আসছেন। এখান থেকে তিনি ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভারত যাবেন।

গত ৩০ বছরে এটি প্রথম চীনের রাষ্ট্রপতির ঢাকা সফর। এর আগে ১৯৮৬ সালে তৎকালীন চীনের প্রেসিডেন্ট  লি শিয়াননিয়ান ঢাকা সফর করেন শি জিংপিং ২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কা এবং ২০১৫ সালে পাকিস্তান সফর করেন। এর আগে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে যান।

এসএসজেড/ এপিএইচ

আরও পড়ুন: 

চীনের সঙ্গে সই হবে ২৫টি চুক্তি ও স্মারক