‘দেশের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে’

বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাআন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন প্রয়াসে আমাদের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে।’ সোমবার বিকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিদ্যমান অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে। বিশ্বব্যাংক আমাদের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। আমাদের এই প্রয়াসে বিশ্বব্যাংক আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে—এ প্রত্যাশা করছি।’
প্রধানমন্ত্রী এ সময় দেশের সব উন্নয়ন পরিকল্পনা, ‘রূপকল্প ২০২১’ এবং ‘রূপকল্প ২০৪১’ জাতির পিতার ক্ষুধা-দারিদ্র্য-অশিক্ষা এবং বঞ্চনামুক্ত ‘সোনার বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্যে প্রণীত বলেও উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমাদের সমস্ত উন্নয়ন পরিকল্পনা, ‘রূপকল্প ২০২১’ এবং ‘রূপকল্প ২০৪১’ জাতির পিতার ক্ষুধা-দারিদ্র্য-অশিক্ষা এবং বঞ্চনামুক্ত ‘সোনার বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত।’’

বাংলাদেশকে অমিত সম্ভাবনার দেশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এদেশের মানুষ অত্যন্ত সাহসী, দৃঢ়চেতা ও পরিশ্রমী। নিজেদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আমরা দৃঢ়-প্রত্যয়ী।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে মানব-উন্নয়ন সূচকে মধ্যম ক্যাটাগরির দেশ এবং মাথাপিছু আয় বিবেচনায় নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমরা শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটাগরি থেকে বেরিয়ে আসব এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এগিয়ে যাওয়ার পথে আমাদের সামনে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমাদের জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের জনমিতিক সুবিধা’র (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) সদ্ব্যবহার করতে হবে। এ লক্ষ্যে আমরা ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বেশ কিছু হাইটেক পার্ক, সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্ক প্রতিষ্ঠাসহ বেসরকারি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) বাস্তবায়ন ও অর্জনে বাংলাদেশ অন্যতম সফল দেশ হিসেবে বিবেচিত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এমডিজি বাস্তবায়নের দৃঢ় ভিত্তিকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা এসডিজি’স বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য এসব লক্ষ্যসমূহ জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করেছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নির্ধারিত সময় ২০৩০ সালের পূর্বেই এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। একটি উচ্চ-পর্যায়ের তদারকি টিম এসডিজি বাস্তবায়ন কার্যক্রম সমন্বয় ও পরিবীক্ষণ করছে।’

একটি মধ্যম আয়ের দেশের অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে প্রবৃদ্ধি সঞ্চারী কাঠামোগত রূপান্তরের একাধিক বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অপুষ্টিজনিত সমস্যামুক্ত জনগোষ্ঠী জাতীয় উন্নয়নের প্রধান সম্পদ। ১৯৯০ সাল থেকে বাংলাদেশে অপুষ্টিতে ভোগা জনগোষ্ঠীর হার ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও, আর্থ-সামাজিক অন্যান্য ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হয়নি। কম ওজন, খর্বাকৃতি ও অন্যান্য অপুষ্টিজনিত সমস্যাগ্রস্ত শিশুর সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য মাতৃ ও শিশু পুষ্টি উন্নয়নের লক্ষ্যে এ খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জাতীয় পুষ্টিনীতি ২০১৫ প্রণয়ন করেছি। ভবিষ্যতে আমরা পুষ্টি সেবা কার্যক্রম আরও প্রসারিত করতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘‘দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন ফোরামে আমি বহুবার উল্লেখ করেছি যে, বিশ্ব আজ সন্ত্রাস এবং সহিংস জঙ্গিবাদ নামক দু’টি অন্যতম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। যে কোন ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে আমার সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। দেশের জঙ্গিবাদ দমনে আমরা সক্ষম হয়েছি। জঙ্গিবাদের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ভবিষ্যতে জঙ্গিবাদ দমন কার্যক্রমকেও আরও শাণিত করা হবে।’’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট অনেক দুর্যোগ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য সফলতা অর্জন করেছে।’ তিনি বলেন, ‘২০০৯-১০ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ছিল ২৮৫ বিলিয়ন টাকা, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৩৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন টাকা।’

এ সময় বিদ্যুৎ, জ্বলানী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে দেশের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৪ সালে ১৪২তম স্থানে উন্নীত হয়েছে।’

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে ইতোমধ্যে প্রযুক্তি-নির্ভর আধুনিক রাষ্ট্রের কাতারে সামিল হয়েছে।’

কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাস রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ১৪৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬৪তম। অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সংক্রান্ত ৪টি সূচকেই বাংলাদেশের অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘জলবায়ু সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তহবিল, বিশেষ করে ‘গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড’ সৃষ্টি অনেক প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু, পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে এ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো আশানুরূপ অর্থায়ন পায়নি। এ অর্থায়ন প্রক্রিয়া সহজ করার লক্ষ্যে পদ্ধতিগত সংস্কার জরুরি।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ সফররত বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বিশ্ব ব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানা ডিক্সন বক্তৃতা করেন। বিশ্ব ব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্ট পল রোমার অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. মেজবাহ উদ্দীন অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জানান।

অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, মার্কিন রাষ্ট্রদূত, সংসদ সদস্য, সরকারি-বেসরকারি এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সূত্র: বাসস

/এমএনএইচ/