পঁচাত্তরের পত্রিকা জেলহত্যার নির্মম সাক্ষী

পঁচাত্তরে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা

পঁচাত্তরের সারাবছর ধরেই একের পর এক হত্যা করা হয় বাংলাদেশের অবিস্মরণীয় নেতাদের। ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পর ৩ নভেম্বর কারাগারে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের কাণ্ডারি চার জাতীয় নেতাকে। কিন্তু সেসময় থেকে শুরু করে ১৯৯৫ পর্যন্ত বদলে যেতে দেখা যায় বাংলাদেশের ইতিহাস। সামরিক অবৈধ ক্ষমতার প্রভাব পড়ে সে সময়ের পত্রিকার পাতায় পাতায়। একের পর এক জাতীয় নেতাদের চলে যাওয়ার খবর কোনও রকমে প্রকাশ করা হলেও পরের বছর থেকে হারিয়ে যায় চার নেতার অস্তিত্ব। আর ১৯৭৫ এর পত্রিকাতেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা সংক্রান্ত খবরের অস্তিত্ব পাওয়া যায় খুবই সামান্য।

সে সময় আওয়ামী লীগের নেতারা বেশিরভাগই কারাবন্দি। তারা বলছেন, আমাদের কথা বলার সুযোগ ছিল না। আর কারাগারে বসে চার নেতার হত্যার খবর শুনে অসহায় এই নেতাকর্মীরা নির্ধারণ করতে পারেননি করণীয়।

১৯৭৫ সালের পত্রিকাগুলোতে দেখা যায়, তিন নেতার হত্যার খবর লিড নিউজ হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে যেটি কল্পনাও করা যায়নি। হত্যাকাণ্ড গভীর রাতে হওয়ার কারণে চার তারিখের পত্রিকায় সে খবর প্রকাশিত না হলেও ৫ তারিখের পত্রিকায় লিড নিউজ আকারে দেখা যায় তৎকালীন দৈনিক বাংলা পত্রিকায়। যেখানে তিনটি সংবাদ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এক, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের হত্যাকাণ্ড তদন্তে বিচারবিভাগীয় তদন্ত, চিফ অব আর্মি স্টাফ পদে খালেদ মোশাররফ এবং তাহের উদ্দন ঠাকুর ও শাহ মোয়াজ্জেমের গ্রেফতারের খবর গুরুত্ব পেয়েছে।

চিত্র: দৈনিক বাংলা

৫ নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সৈয়দ নজরুল, মনসুর আলী, কামরুজ্জামান ও তাজউদ্দীন নিহত, প্রধান খবর হলেও কোনও ছবি প্রকাশ করা হয়নি। বরং বড় আকারে ঢাকায় সান্ধ্য আলো জ্বালানোর ফলে পোকার উপদ্রবের ছবি ছাপানো হয়েছে।এ পত্রিকাতেও চিফ অব স্টাফ হিসেবে খালেদ মোশাররফের দায়িত্ব নেওয়ার খবর বক্স আকারে প্রকাশ করা হয়।

চিত্র দৈনিক ইত্তেফাক

ইংরেজি পত্রিকাও একইভাবে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ধরনের খবর প্রকাশ করে সে সময়। ৫ তারিখের ডেইলি বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস এর প্রথম পাতায় একইভাবে দেখা যায়, এই খবরগুলো শুরুতে দেওয়া হলেও সেখানে আসল ঘটনার কোনও  উল্লেখ নেই। নিহত হওয়া, নিহতের জানাজা, দাফন এবং একটি ‘উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিশনের’ খবর দিয়েই সবগুলো পত্রিকা তাদের দায়িত্ব সেরেছে।

চিত্র: বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস

ঠিক পরের বছরের পত্রিকাগুলোর ৩ নভেম্বরের পাতায় জেলহত্যা দিবসের কোনও উল্লেখ নেই। সেদিনের পত্রিকায় প্রথম বা শেষের পাতায় উল্লেখযোগ্য ছবি ছিল হজ পালকারীদের যাত্রা উপলক্ষে দোয়া মাহফিলের। আর ইত্তেফাকের প্রধান নিউজ হিসেবে দেখা যায় ‘মোজাম্বিকে রোডেশিয় বাহিনীর হামলা’; ‘বুড়ুন্ডিতে অভ্যুত্থান’।

সেই সময়ের পরিস্থিতি স্মরণ করতে গিয়ে তোফায়েল আহমেদ এর আগে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, চার নেতার হত্যাকাণ্ডের খবর তিনি ময়মনসিংহ জেলে বসে জানতে পারেন। করণীয় কিছু নির্ধারণের উপায় ছিল না। আর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে তারা এ দেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সব মানুষদের  নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল।

কৃতজ্ঞতা: সিবিজিআর ও আইসিএসএফ

 /ইউআই  /এপিএইচ/