ভারতে ৫০০ ও হাজার রুপির নোট বাতিল

মানিচেঞ্জারের দাপটে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে সফররত বাংলাদেশিরা

মানিচেঞ্জার

ভারতে হঠাৎ করেই ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট নিষিদ্ধ হওয়ায় অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়েছেন সেদেশে অবস্থানকারী হাজারও বাংলাদেশি। সফররত বাংলাদেশিদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্তের কারণে তাদের লাখ লাখ টাকা গচ্চা যেতে বসেছে। কারণ তাদের অধিকাংশের কাছে ভারতীয় টাকা বলতে যা আছে তার প্রায় সবটাই ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট। এদিকে সরকারি ঘোষণার পর ভারতীয় মানিচেঞ্জার ব্যবসায়ীরা ছোট নোটের অভাব সৃষ্টি করে বাংলাদেশি টাকার মান অর্ধেকে নামিয়ে এনে লুটপাট চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতে যাতায়াতকারী বাংলাদেশিদের একটা বড় অংশই যান চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। তাদের মধ্যে রয়েছেন রোগী এবং রোগীর আত্মীয়-স্বজন। তারা চেন্নাই, ভেলর, দিল্লি, মুম্বাই, উত্তর প্রদেশসহ কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যান। রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করে আত্মীয়দের বেশিরভাগই ওঠেন হাসপাতাল লাগোয়া হোটেল ও অতিথিশালায়। কেউ কেউ দৈনিক ভাড়ায় কোনও বাড়িতে বা হোটেলে ঘর নিয়ে রয়েছেন। কিন্তু ডলার ভাঙিয়ে বা বাংলাদেশি টাকা দেশ থেকে ভাঙিয়ে যত ভারতীয় টাকা তারা নিয়েছেন তার বড় অংশই অচল হয়ে যাওয়ায় এক দিকে যেমন রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা দৈনন্দিন খরচের ঝামেলায় পড়েছেন, তেমনই সমস্যা হচ্ছে রোগীদের চিকিৎসার খরচেও।

বুধবার রাত থেকেই অধিকাংশ হাসপাতাল ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট নেওয়া বন্ধ করে দেয়। বৃহস্পতিবার হাসপাতাল, হোটেল, বাস ও রেল স্টেশন, বিমানবন্দর সবখানেই এসব নোট গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হঠাৎ যাওয়া রোগীরা অনেকে ভর্তি হতে পারেননি, তেমনি যাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার কথা ছিল তারাও ছাড়পত্র নিতে পারেননি। এমনকি দেশে ফিরে আসার ভাড়াও যোগাতে পারেননি কেউ কেউ।

গত সপ্তাহে খুলনার এক রোগী ভর্তি ছিলেন কলতাকায় ইএম বাইপাস লাগোয়া মুকুন্দপুরের একটি নার্সিংহোমে। বুধবার তার ছাড়পত্র পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রোগীর আত্মীয়দের হাতে থাকা ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নেয়নি। ওই রোগীর এক আত্মীয় বলেন, ‘উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ায় তাদের কয়েকজন আত্মীয় আছেন। তাদের সহায়তায় সমস্যার সমাধান হয়েছে। তারা ডেবিট কার্ডে হাসপাতালের খরচ মিটিয়ে দেবেন। পরে আমরা দেশে ফিরে গিয়ে ওদের টাকা পাঠিয়ে দেবো।’

একই পরিস্থিতির শিকার হন রাওতাড়া মাগুরার তানভির আহমেদ এবং শাহনাজ আলী। চিকিৎসার জন্য তারা ভারতে গিয়েছিলেন। চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিপদে পড়েন তারা।  চিকিৎসা শেষে হাসপাতালে বিল মেটাতে গিয়েও ঝামেলায় পড়েন। অবশেষে শতকরা ২০ রুপি অতিরিক্ত কমিশন দিয়ে টাকা পাল্টাতে হয়েছে তাদের। অর্থাৎ ৫০০ রুপির নোট দিয়ে ৪০০ রুপি এবং ১০০০ রুপির নোট দিয়ে ৮০০ রুপির বাংলাদেশি বিনিময় টাকা পেয়েছেন তারা।

ভারত সরকারের এই আচমকা ঘোষণায় টুরিস্ট ভিসায় ভারতে যাওয়া বাংলাদেশিরাও চরম বিড়ম্বনায় পড়েছে। বেনাপোল দিয়ে ফিরে আসা কয়েকজন টুরিস্ট জানান, ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট দিয়ে মিলছে না অর্ধেক দামও। বুধবার শতকরা ২০ রুপি অতিরিক্ত কমিশন দিয়ে টাকা মিললেও বৃহস্পতিবারের অবস্থা ছিল আরও ভয়াবহ। ৫০০ রুপির নোট দিয়ে ২৫০ রুপির বাংলাদেশি বিনিময় মূল্য মিলেছে এদিন। আর ১০০০ রুপির নোট দিয়ে ৫০০ রুপির বাংলাদেশি বিনিময় মূল্য মিলেছে। তাও নিতে হয়েছে ভারতীয় মানি চেঞ্জারদের হাত-পা ধরে।

কয়েকজন পাসপোর্টযাত্রী জানান, ভারত সরকারের এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছেন ভারতীয় মানি চেঞ্জাররা। অচল টাকা তারা নেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। অবশেষে অনেক অনুনয় বিনয় করে ৬০ শতাংশ কমিশন দিতে হয়েছে। বেনাপোলের  বিপরীতে পেট্রাপোল চেকপোস্টের মানি চেঞ্জাররা যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে। দুপুরের পরে ৫০০ রুপির নোট দিয়ে ২০০ রুপির বাংলাদেশি বিনিময় মূল্য মিলেছে। আর ১০০০ রুপির নোট দিয়ে ৪০০ রুপির বাংলাদেশি বিনিময় মূল্য মিলেছে। 

টুরিস্টরা জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বৃহস্পতিবার থেকে ব্যাংকে জমা দিয়ে পাল্টে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাও মানছে না ব্যাংকগুলো। বলা হচ্ছে, আগে ব্যাংকে ৫০০ ও ১০০০ রুপি জমা দিতে হবে, তারপর বিনিময় রুপি পাওয়া যাবে। কিন্তু চিকিৎসা নিতে এবং বেড়াতে যাওয়া বাংলাদেশিরা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে না পারায় চরম হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।

এ ব্যাপারে ভারত ফেরত কয়েকজন পাসপোর্টযাত্রী জানান, ভারত সরকারের উচিত বিদেশি পাসপোর্টযাত্রীদের জন্য এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে একটি ব্যবস্থা নেওয়া।

/এফএস/টিএন/