কলকাতায় বাংলাদেশি রোগী ও স্বজনরা এখনও ভোগান্তিতে

নিষিদ্ধ নোট

তিন দিন আগে মুম্বাই থেকে কলকাতায় পৌঁছান বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত সুপারিনটেন্ডেন্ট পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। কাজ সেরে কলকাতায় পৌঁছে কিছু জরুরি জিনিসপত্র কেনাকাটা করবেন। সেই জন্য বাংলাদেশি টাকা ভাঙিয়ে আগেভাগেই দেশ থেকে এক লাখ রুপি মূল্যের নোট সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন তিনি। সবই পাঁচশো আর এক হাজার রুপির নোট, যে দু’ধরনের রুপির নোট বাতিল করেছে ভারত সরকার।

কলকাতায় পৌঁছে খবর নিয়ে জানলেন, ১০০০ রুপির অচল নোট দিয়ে ১০০ রুপির সাতটি নোট পাবেন তিনি। কেউবা দিতে চাইলো হাজারে ছ’শো রুপি। শেষমেশ দেড় দিনের চেষ্টায় ভারতের একটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক অফিসারের সূত্রে ৫০ হাজার রুপির অচল নোট বদল করে তিনি সবগুলো ১০০ রুপির চালু নোট পেয়েছেন। বাকি ৫০ হাজার রুপি তিনি জমা করে দেবেন ঢাকায় স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার শাখায়।

পুলিশের এক জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এমন হাল হলে কলকাতায় চিকিৎসা করাতে আসা সাধারণ বাংলাদেশি ও তাদের স্বজনদের অবস্থাটা কী, সেটা অনুমান করতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। বৈধ নোটের আকালে রোগীদের উপযুক্ত চিকিৎসা হচ্ছে না। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাস লাগোয়া মুকুন্দপুরের একটি হাসপাতালে বাংলাদেশি এক রোগীর এমআরআই করানোর কথা। কিন্তু রোগীর আত্মীয়েরা অচল রুপির নোট বদল করে ভারতীয়  বৈধ নোট জোগাড় করে উঠতে পারেননি।

পাঁচশো ও হাজারের নোট বাতিলের ঘোষণা হওয়ার দু’দিন পর, গত বৃহস্পতিবার (১০ নভেম্বর) কলকাতায় বাংলাদেশের উপ-দূতাবাস থেকে লিখিতভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রাজ্য সরকারকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বহু রোগী কলকাতায় এখন চিকিৎসা করাতে এসেছেন। নোট নিয়ে এই সমস্যার জেরে তাদের চিকিৎসার যেন সমস্যা না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে ভারত সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে অনুরোধ করেছে কলকাতায় বাংলাদেশের উপ-দূতাবাস। কিন্তু সেটা কিভাবে ও কি পদ্ধতিতে সম্ভব, উপ-দূতাবাসের উদ্বেগ প্রকাশ করে লেখা ওই চিঠিতে তার কোনও প্রস্তাবনা নেই বলে রাজ্য সরকারের একটি সূত্রের বক্তব্য।  

কয়েকটি হাসপাতাল বাংরাদেশ  থেকে আসা অসহায় রোগী ও তাদের বাড়ির লোকজনের কথা ভেবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অচল নোট জমা নিয়েছিল। সে ক্ষেত্রে যিনি জমা করেছিলেন, তার সচিত্র পরিচয়পত্রের অনুলিপি দিতে এবং নিজের বিস্তারিত বিবরণ ও জমা করা নোটগুলোর নম্বর উল্লেখ করে একটি ফর্ম পূরণ করতে হয়েছিল। শুক্রবার থেকে সে সুযোগও বন্ধ রয়েছে। এখন বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে কেবল ডলার চাইছে হাসপাতালগুলো।

ই-এম বাইপাস লাগোয়া একটি বেসরকারি হাসপাতালের এমআরআই-এর এক শীর্ষ কর্মকর্তা সোমবার বাংলা ট্রিবিউনকে বললেন, ‘কারও কাছে বাংলাদেশি টাকা থাকলেও অসুবিধে নেই। আমরাই ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, যাতে তিনি সঠিক দামে ওই টাকা ভাঙিয়ে ডলার কিনতে পারেন। সেই ডলার আমরা জমা নিচ্ছি।’ কিন্তু অচল ভারতীয় টাকা ছাড়া অন্য কিছু না থাকলে?  এম আর আই-এর ওই কর্মকর্তা বলছেন, ‘সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তার যে অ্যাকাউন্ট আছে, সেখান থেকে আমরা আমাদের হাসপাতালের অ্যাকাউন্টে ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার (এনইএফটি) পদ্ধতিতে টাকা দিতে বলেছি। সেই জন্য কোথায় যেতে হবে, কোন স্লিপ কিভাবে পূরণ করতে হবে, তার ব্যবস্থাও আমরা করছি। ওই টাকা আমাদের অ্যাকাউন্টে ঢুকলে তো কোনও সমস্যা নেই।’

তবে রোগীদের সঙ্গে আসা আত্মীয় বা পরিচিত মানুষদের অনেকেই খাওয়ার কষ্ট পাচ্ছেন। মাথার ওপর ছাদ পেতেও সমস্যা হচ্ছে। হাতে যে সামান্য ১০০ টাকার নোট সম্বল, তা বাঁচিয়ে রাখতে কেউবা রাতে মুড়ি খেয়ে ডিনার সারছেন, কেউবা সকালে শুধুই চা-বিস্কুট দিয়ে  নাস্তা করছেন।

ই এম বাইপাসের পঞ্চসায়রের শান্তিপল্লির প্রচুর লজ, গেস্ট হাউসে বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষেরা মাঝেমধ্যেই ওঠেন। বিশেষ করে রোগীর আত্মীয়স্বজনেরা। সেখানকার কেউ কেউ অবশ্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। থাকার জন্য ভাড়া আপাতত নেওয়া হচ্ছে না। টাকা লাগছে না খেতেও। কেউ আবার উপযাজক হয়ে অচল ৫০০, ১০০০-এর নোট পাল্টে দিচ্ছেন। এমন এক লজ মালিক পার্থপ্রতিম সরকারের কথায়, ‘আমরা তো টাকা জমা দিতে পারব আজ না হয় কাল। কিন্তু ওরাতো আমাদের দেশে এসে বিপদে পড়েছেন। এই অবস্থায় আমরা পাশে না দাঁড়ালে ওদের কী হবে? মানুষতো মানুষেরই জন্য। আর আমার পূর্ব পুরুষের শেকড় তো বাংলাদেশেই!’

এপিএইচ/

আরও পড়ুন:  

মকবুলের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ আছে: তদন্ত সংস্থা