আজ ১৪ ডিসেম্বর, বুধবার। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে ১৯৭১ সালের এ দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের পরাজয় আসন্ন জেনে বাঙালিকে মেধাশূন্য করার হীন-উদ্দেশ্যে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা জীবন দিয়ে গেছেন, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও সেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানদের কাছে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে তারা মনে করছেন। তারা বলছেন, বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সবার রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বিজয় তাদের কাছে অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানরা বলেন, ‘আমরা কষ্ট পাই, যখন দেখি, এই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হয়, লেখালেখির জন্যে মানুষ হত্যা করা হয়। যখন দেখি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় কিন্তু অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে, বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে আসা সম্ভব হয়নি, তখন সত্যিই পীড়া দেয়।’
চলতি বছরের ১১ মে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা বাস্তবায়নকারী গুপ্তঘাতক আল-বদর বাহিনীর প্রধান ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তবে বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত আরও দু’জন চৌধুরী মইনুউদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান পলাতক থাকায় তাদের দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। চৌধুরী মইনুদ্দীন যুক্তরাজ্যে ও আশরাফুজ্জামান খান যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক রয়েছে। তাদের ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বিদেশে পলাতক দু’জনকে দেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করতে না পারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তানরা।
জানতে চাইলে শহীদ বুদ্ধিজীবী মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ছেলে তানভীর হায়দার চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িত অনেকের বিচারের রায় কার্যকরের ফলে স্বস্তি বোধ করছি। তবে অনেক সাজাপ্রাপ্ত আসামি বিদেশে পালিয়ে আছে। তাদের রায় কার্যকর না হওয়ায় আমাদের মধ্যে অস্বস্তি কাজ করছে।’ তিনি বলেন, ‘যারা বিদেশে পালিয়ে আছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে কেন সরকার বিদেশি বন্ধুদের আরও চাপ সৃষ্টি করছে না?’
তানভীর হায়দার বলেন, ‘যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ হওয়ার কথা ছিল, তার থেকে এই বাংলাদেশ এখনও অনেক দূরে।’ তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল ক্ষমতায়। এখনও দেশে লেখালেখির জন্য মানুষকে হত্যা করা হয়। ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে আসা হয়নি, এখনও বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন হয়, মুক্তিযোদ্ধাকে পেটানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাবস্থায় এসব ঘটনা ঘটার কথা নয়।’
শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর সন্তান আসিফ মুনীর তন্ময় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেই দিনটি সবসময় আমরা উপলব্ধি করি। শুধু ১৪ ডিসেম্বর এলেই যে উপলব্ধি করি, তা কিন্তু নয়।’ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বাবার হত্যাকাণ্ড এবং তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল চৌধুরী মইনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান। আমার বাবার হত্যার সঙ্গে জড়িতদের রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কাছে বিজয়টা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের আবাসিক শিক্ষক শহীদ বুদ্ধিজীবী জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার একমাত্র সন্তান মেঘনাগুহ ঠাকুরতা বলেন, ‘বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অনেকের শাস্তি হয়েছে। তবে এখনও কেউ-কেউ বাকি আছে।’ তিনি বলেন, ‘চৌধুরী মইনুউদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের দণ্ড কার্যকর করা যায়নি। না হলে বিজয়ের অর্জন পূর্ণাঙ্গ হবে না।’
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, ডা. আলিম চৌধুরী, অধ্যাপক মুনিরুজ্জামান, ড. ফজলে রাব্বী, সিরাজ উদ্দিন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, অধ্যাপক জিসি দেব, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সাংবাদিক খন্দকার আবু তাহের, নিজামউদ্দিন আহমেদ, এসএ মান্নান (লাডু ভাই), এ এন এম গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ নাজমুল হক, সেলিনা পারভিন প্রমুখ।
/এমএনএইচ/