পুলিশ সদর দফতর থেকে পাওয়া শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ সদস্যদের তালিকায় দেখা যায়, ঢাকা জেলা পুলিশের ৫০ জন, রিজার্ভ পুলিশের ১৪০ জন, ফরিদপুর জেলায় চার জন, ময়মনসিংহে ২৩ জন, টাঙ্গাইলে ছয় জন, এআইজি টেলিকম ঢাকা অফিসের সাত জন, সিআইডি ঢাকার দুই জন, দুর্নীতি দমন সংস্থায় প্রেষণে কর্মরত তিন জন, চট্টগ্রাম জেলার ৭১ জন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার ২৩ জন, কুমিল্লার ২৫ জন, নোয়াখালীর ৯ জন, সিলেটের ১৩ জন, রাজশাহী রেঞ্জ অফিসের তিন জন, রাজশাহী জেলার ৬০ জন, রংপুর জেলার ২৩ জন, বগুড়া জেলার ২১ জন, পাবনা জেলার ৩০ জন, দিনাজপুরের ২১ জন, সারদা পুলিশ একাডেমির ৩৯ জন, খুলনা জেলার ৭০ জন, কুষ্টিয়া জেলার ৩৩ জন, বাখেরগঞ্জ জেলার (বর্তমানে বরিশাল) ১৪ জন, পটুয়াখালীর ছয় জন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশের ৪৩ জন পুলিশ সদস্য শহীদ হয়েছেন। ৭৩৯ শহীদ পুলিশ সদস্যের মধ্যে সাত জন কর্মকর্তাও রয়েছেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে আক্রমণ করে, তখন সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সারা দেশের পুলিশ স্টেশনগুলোতে বেতারের মাধ্যমে সেই খবর ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তখনকার ওয়্যারলেস অপারেটর কনস্টেবল শাহজাহান মিয়া।
বাংলা ট্রিবিউনকে শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে হামলার পর পুলিশ সদস্যরাও পাক হানাদার বাহিনীকে লক্ষ্য করে থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে গুলি করে আক্রমণের পাল্টা জবাব দেন। পাল্টা আক্রমণে হতভম্ব হয়ে পড়ে পাক বাহিনী। পরে আরও শক্তি নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে। এতে অনেকেই শহীদ হন সেই রাতে ও পরেরদিন।’
মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর অবদান ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে কাজ করেন এমন কর্মকর্তারা জানান, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দুপুর দু’টার পর থেকে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা নানা ধরনের গোয়েন্দা তথ্য পেতে থাকেন। এরপরই কন্ট্রোল রুম থেকে শহরের বিভিন্নস্থানে পুলিশের টহল টিম পাঠানো হয়। বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে পুলিশ সদস্যরা খবর দিতে থাকেন যে, শহরের পরিস্থিতি থমথমে ও জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
রাত ১০ টার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে পুলিশের একটি টহল টিম বেতার মারফত জানায়, পাক বাহিনীর একটি বড় ফোর্স যুদ্ধসাজে শহরের দিকে এগুচ্ছে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে খবর আসে, তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান ও বর্তমানে রমনা পার্কের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সেনাবাহিনীর বেশ কিছু সাঁজোয়া যান অপেক্ষা করছে। এসব খবর পেয়ে রাজারবাগের বাঙ্গালি পুলিশ সদস্যরা যে যার মতো প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
শাহজাহান মিয়া আরও জানান, ‘রাত ১২টার দিকে বাঙালি পুলিশ সদস্যদের মরণপণ প্রতিরোধ থমকে যায় ট্যাংক ও কামান সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর মর্টার ও হেভি মেশিনগানের গুলি বর্ষণে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের চারটি ব্যারাকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় আটশ’ সদস্য ট্যাংক বহরসহ প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করে। এ সময় তাদের হাতে অনেক বাঙালি পুলিশ সদস্য হতাহত হন। আটক হন আরও ১৫০ জন পুলিশ সদস্য।
মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদান নিয়ে একটি বই লেখেন এআইজি আবিদা সুলতানা। ‘শহীদ পুলিশের রক্তের ঋণ’ নামের ওই বইয়ের মুখবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ‘২৫ মার্চ কালো রাতে রাজারবাগের পুলিশ সদস্যরা প্রথম থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে প্রতিরোধ শুরু করেন। পুলিশের বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের খবর ছড়িয়ে দেওয়ার পর প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন সারা দেশের পুলিশ সদস্যরা। বাঙালি পুলিশ সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের পাশাপাশি পুলিশের কাছে থাকা অস্ত্র ও গোলাবারুদ মুক্তিকামী মানুষের হাতে তুলে দেন।’
ছবি: নাসিরুল ইসলাম
জেইউ/এপিএইচ/