আশকোনার ২ নারী জঙ্গিকে নিয়ে ৫ এলাকায় অভিযান

পুলিশের পাহারায় দুই নারী জঙ্গি (বোরকা পরিহিত)আশকোনার জঙ্গি আস্তানা থেকে গ্রেফতার দুই নারী জঙ্গিকে নিয়ে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে অন্তত পাঁচটি এলাকায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। তবে এসময় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। ওই দুই নারী জঙ্গি পুলিশের কাছে যাদের নাম বলেছে, তাদেরও ওই ঘটনায় আসামি করা হয়েছে। এছাড়া আরও তিন-চারজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। সোমবার গ্রেফতারকৃত দুই নারীর প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

পুলিশ জানিয়েছে, দুই নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার দিনই রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী, যাত্রাবাড়ী এবং ঢাকার বাইরে সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। তবে এসময় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

দুই নারী জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, মো. মইনুল ইসলাম ওরফে আবু মুসা (২৯) ইমতিয়াজ নামে পূর্ব আশকোনার ৫০ নম্বর বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল। তার সঙ্গে রাশেদুল রহমান সুমন (২৪), মো. সেলিম (২৬) ও  মো. ফিরোজ (২০) ও অজ্ঞাত আরও ৩/৪ জন ওই বাসায় প্রায়ই আসতো। তারা বাসায় বসে বিভিন্ন নাশকতার পরিকল্পনা করতো। এদের মধ্যে মুসার বাড়ি রাজশাহীর বাঘমারা থানার বুজরাত কোলা গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত কামাল হোসেন। তবে সুমন, সেলিম, ফিরোজ ও অজ্ঞাত ৩/৪ ব্যক্তির ঠিকানা অজ্ঞাত। তাদের পুরো ঠিকানা বলতে পারেনি ওই দুই নারী।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহীনুল ইসলাম বাদী হয়ে দক্ষিণ খান থানায় যে মামলা দায়ের করেছেন, তাতে এদের সবাইকে আসামি করা হয়েছে।

আসামিরা হলো- ১. তৃষা মনি ওরফে উম্মে আয়েশা (২২), পিতা- আব্দুস সামাদ আলী, মাতা- নাজমা বেগম, স্বামী- মইনুল ইসলাম ওরফে আবু মুসা, গ্রাম- সাইপাড়া (সামাদ সরদারের বাড়ি), থানা- বাঘমারা, জেলা- রাজশাহী। ২. জেবুন্নাহার ওরফে শিলা ওরফে সুমাইয়া ওরফে মারজুন (৩৪), পিতা- হাজী মমিনুল ইসলাম মজুমদার, মাতা- জোহরা আক্তার চৌধুরী, স্বামী- মৃত মেজর জাহিদুল ইসলাম ওরফে জাহাঙ্গীর আলম মুরাদ ওরফে মেজর জাহিদ, গ্রাম-মধ্য ধনাইতরী (বড় বাড়ি) থানা- সদর দক্ষিণ, জেলা- কুমিল্লা ।৩. মৃত শাকিরা ওরফে তাহিরা (৩৫), পিতা- ঠিকানা অজ্ঞাত। ৪. মৃত আফিফ কাদেরী ওরফে আদর (১৪), পিতা- ঠিকানা অজ্ঞাত। ৫. মো. মইনুল ইসলাম ওরফে আবু মুসা (২৯), পিতা- মৃত, কামাল হোসেন, মাতা- সুফিয়া বেগম, গ্রাম- বুজরাত কোলা ,থানা- বাঘমারা, জেলা- রাজশাহী। ৬. রাশেদুর রহমান সুমন (২৪), পিতা ও ঠিকানা- অজ্ঞাত। ৭. মো. সেলিম (২৬), ঠিকানা- অজ্ঞাত ও ৮. মো ফিরোজ (২০) এবং অজ্ঞাত আরও ৩/৪ জন।    

এজাহারে এসআই শাহীনুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, ‘দেশের ভেতরে জঙ্গি কার্যক্রম প্রসারিত ও নাশকতা চালানোর জন্য আশকোনার ওই বাসায় প্রায়ই পরিকল্পনা হতো। তবে মুসা সেখানে মাঝেমাঝে আসতো।’

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পুলিশের অভিযানের পর জঙ্গি আস্তানায় বিভিন্ন ধরনের টাকার নোটের পোড়া অংশ, দুইটি পোড়া ল্যাপটপ, মোবাইলের পোড়া অংশ, বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরিত স্প্লিন্টার পাওয়া গেছে। ক্যামব্রিজ অ্যাডভান্স লার্নারের একটি ইরেজি অভিধান পাওয়া গেছে। যার ভেতর কেটে বিশেষ কায়দায় রিভলবার রাখা হতো।’

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এই আস্তানায় নিহত, আহত, গ্রেফতার ও পলাতক সব জঙ্গিরা নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য। তারা নাশকতার জন্য নিজেদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র রেখেছিল। এসব কাজে পলাতকরা বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে।’

শুক্রবার (২৩ ডিসেম্বর) মধ্যরাত থেকে রাজধানীর দক্ষিণখান থানাধীন পূর্ব আশকোনার ৫০ নম্বর বাসার নিচতলায় অভিযান চালায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ। রাতভর বাড়িটিকে ঘেরাও করে রাখা হয়। ভোরে ভেতরে থাকা জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানানো হয়। এ নিয়ে জঙ্গিদের সঙ্গে কয়েকঘণ্টা দেনদরবারও চলে। পরে সকাল ১০টার দিকে তৃষা মনিসহ দুই নারী জঙ্গি তাদের সন্তান নিয়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণকারী জঙ্গি নারীরা হলো রূপনগরের অভিযানে নিহত মেজর (অব.)  জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী জেবুন্নাহার ইসলাম ওরফে শীলা। এ সময়  সুইসাইডাল ভেস্টের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শাকিরা নামে এক নারী ও  পুলিশের গোলাগুলিতে আফিফ কাদেরী আদর নামে এক কিশোর নিহত হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরে এক অভিযানে আফিফের বাবা তানভীর কাদেরী নিজেই আত্মহত্যা করে মারা যায়। ওই সময় আফিফের জমজ ভাই তাহরীম ও মা আবেদাতুল ফাতেমাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘জঙ্গিরা এখানে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক মজুত করে রেখেছিল। ধারণা করা হচ্ছে, তারা বড়দিন অথবা থার্টি ফার্স্ট নাইটে বড় ধরনের  নাশকতার পরিকল্পনা করেছিল।’

তিনি বলেন, ‘আত্মসমর্পণকারী জঙ্গি নারীদের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, জঙ্গি আস্তানায় ১২ লাখ টাকা ছিল। সেই টাকা তারা পুড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ডকুমেন্টস তারা পুড়িয়েছে। সে আলামতও আমরা পেয়েছি।’

জঙ্গিদের হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে সাংবাদিকদের  এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সুইসাইডাল ভেস্ট পরে আত্মহত্যা করা নারী ও তার সঙ্গে থাকা শিশুটিকে দিয়ে আত্মঘাতী হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের।’

/এআরআর/ এপিএইচ/