আরেকটি নতুন বছর মানে নতুন করে শুরুর সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনা জিইয়ে রেখে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে এসেছে ২০১৭। নববর্ষ মানে আশার জোয়ার, নতুন স্বপ্ন বোনা৷ পুরোনো যা কিছু তা বিদায় জানিয়ে নতুনের আবাহন, যে পারে সেই পারে।
বাংলাদেশ তার জন্মের ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে পেরে দেখিয়েছে। সেই পরম্পরাতেই সব সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের উত্থানকে থামিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে বাংলাদেশ শুরু করবে নতুন একটি বছর- এই প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষায় দেশের সব মানুষ।
গত বছর বাংলাদেশ জঙ্গি হামলার বেশ কয়েকটি নতুন ঘটনা দেখেছে। নতুন করে পরস্পরকে আঁকড়ে ধরেই যে বাঁচার রাস্তা তৈরি হয়, তা বুঝতে শিখেছে। ২০১৬ সালের শুরুতে এলোপাতাড়ি হামলায় বিপর্যস্ত মানুষ বছরের শেষের দিকে এসে জানতে পারে ‘নব্য জেএমবি’ হামলাগুলো ঘটিয়েছে। তবে দুর্বৃত্তদের সব ষড়যন্ত্র ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
এই সব আশঙ্কা সরিয়ে রেখে ভালোভাবে বাঁচার জন্য সামাজিকায়নের পথে হাঁটার কথা বলছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, বাংলাদেশের চিরন্তন ঐতিহ্য অসাম্প্রদায়িকতার পথে ফিরে যাওয়ার এখনই সময়।
বাংলাদেশকে তার অপার মুক্তবুদ্ধির জায়গা থেকে সরিয়ে আনার ষড়যন্ত্রে বছরজুড়ে ‘টার্গেট’ করে একের পর এক চলতে থাকে সহিংস আক্রমণ ও গুপ্তহত্যা। সবকিছু ছাপিয়ে যায় ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গিদের নৃশংসতা। যে ঘটনার স্তম্ভিত হয় সারা দেশ। জঙ্গিরা ২০ জন দেশি-বিদেশিকে হত্যার মধ্যে দিয়ে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার যে অপচেষ্টা করেছিলো, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখাও ছিল দুঃসাধ্য। তবে সেই দুঃস্বপ্নকে দূর করে বাংলাদেশকে নতুন পথের সন্ধান দেখানোর লক্ষ্যে জঙ্গিদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযান চলে দেশজুড়ে। অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০১৭ সালে বিশ্ব-দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখা খুবই জরুরি। জঙ্গিবাদ যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আটক জঙ্গিদের বিচার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
আগামীর বাংলাদেশ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ২০১৬ তে যে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটতে দেখা গেছে, বছরের শেষে কিন্তু তা নির্মূলের একটা কাঠামোগত ধরণ আমরা লক্ষ্য করেছি। এই ট্রেন্ডটা ধরে রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কখনোই জামায়াতকে প্রশ্রয় দেয়নি। তেমনই জঙ্গিবাদকেও তারা ব্যাপকভাবে প্রশ্রয় দিবে, এটা ভেবে নেওয়ার কিছু নেই। যে জঙ্গিরা ধরা পড়ছে তাদের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্কটা ভেঙে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
ফেলে আসা বছর নিয়ে কিছুটা হতাশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ২০১৬ আমাদের জন্য, বাংলাদেশের জন্য ভালো কাটেনি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর একের পর এক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। আবার আরেকদিকে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে। এ দুটো বিষয় বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছে। তিনি আরও বলেন, এসব ঘটনা বারবার ঘটতে দিলে বাংলাদেশের যে অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি, তা নষ্ট হবে। কিন্তু বাঙালীর ইতিহাস সবসময়ই ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। ফলে আমি বিশ্বাস করি, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ তার সঠিত পথ চিনতে ভুল করবে না।
ভুক্তভোগীদের কণ্ঠেও ফিরে এসেছে নতুন করে শুরুর গল্প। সরকারের বিশেষ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গিদের দল থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছে অনেকে। এটাই দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাচ্ছে অনেককে। তবে সবকিছুর বাইরে নতুন করে সামাজিকায়নে মনোযোগী হওয়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন সমাজবিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সাদেকা হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের সমাজে নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন বেড়ে যাওয়া এবং নৃশংসতার মাত্রা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করার পিছনে কারণ হিসেবে সামাজিকভাবে আমাদের বিচ্ছিন্নতাকেই দায়ী করতে চাই। আমরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাউকে সুবিধা করে দিয়েছি কিনা, সেটা নিয়ে গবেষণার দরকার আছে। সেই বন্ধনের জায়গাটা দৃঢ় করতে পারলে আগামী সুন্দর হবে, স্বস্তির হবে।
বাংলার মাটি ও সমাজ নিয়ে এই বিশ্লেষণগুলো বলে দেয়, বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনার মধ্যে আছে। আগামী বছর যেমন নতুন স্বপ্ন বোনার, তেমনই দেশটাকে ভালোবাসার। সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা।
/ইউআই/এএআর/
ছবি: নাসিরুল ইসলাম
আরও পড়ুন:
বিদায় ২০১৬: জঙ্গিবাদের উত্থান-পতনের বছর