রাজধানীতে বস্তি কিংবা মার্কেটে আগুন লাগার ঘটনা নতুন নয়। গত ৪ ডিসেম্বর বনানীর কড়াইল বস্তি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ঠিক তার এক মাস পর গুলশান ১-এর ডিএনসিসি মার্কেটও ভস্মীভূত হয়ে গেছে। এত ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ড নিয়ে ভুক্তভোগী থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে দেখা দিয়েছে সন্দেহ। আগুন লাগার পর এক বা একাধিক তদন্ত কমিটি করা হলেও কোনও কোনও কমিটি প্রতিবেদনই প্রকাশ করে না। আবার কখনও প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও কারও দোষ খুঁজে পাওয়া যায় না।
ভুক্তভোগীদের অনেকের দাবি, বস্তি-মার্কেট উচ্ছেদ করার জন্য ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ আগুন দেওয়া হয়। আর তাই পরবর্তী সময়ে কোনও বিচারিক পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। তাদের মতে, বস্তি উচ্ছেদে ব্যর্থ হয়ে কিংবা পুরোনো মার্কেটের জায়গায় বহুতল ভবন তৈরির আকাঙ্ক্ষা থেকে এ ধরনের ‘নাশকতা’ ঘটানো হয় কিনা, তা নিয়ে বরং তদন্ত করা উচিত।
মঙ্গলবার (৩ জানুয়ারি) গুলশানের ডিসিসি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের পর আবার দেখা দিয়েছে এমন সন্দেহ। মার্কেটটির একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বহুতল ট্রেড সেন্টার নির্মাণ নিয়ে তাদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তাদের সন্দেহ, মার্কেট ভেঙে ফেলার জন্যই এই অগ্নিকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
পুড়ে যাওয়া একটি দোকানের কর্মচারী রেজাউল হকের মনেও একই সন্দেহ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে এলাকা থেকে আগুন ছড়িয়েছে, সে এলাকায় মাত্র কয়েক দিন আগে বিদ্যুতের লাইন বদলানো হয়েছে। এটা বদলানোর সময়ই আমরা বলেছিলাম, দুর্ঘটনা ঘটবে, কাজ ঠিকমতো হয়নি।’
রেজাউল আরও বলেন, ‘আমরা শুনেছিলাম এখানে বড় মার্কেট হবে। মালিক তা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন।’
‘নতুন মার্কেট হলে কি ভালো হয়?’— এমন প্রশ্ন রাখা হয়েছিল ডিসিসি মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির নেতা শেখ হুমায়ুন কবিরের কাছে। জবাবে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘যাদের দোকান আছে তারা এমনি এমনি নতুন মার্কেটে জায়গা পাবেন বলে বিশ্বাস করেন না। হয়তো কিছু কম দাম দিতে হতে পারে। তবে পজেশন তাদের কিনতেই হবে। সেই শঙ্কা থেকেই তারা এই জায়গা ছাড়তে চান না।’
ফায়ার সার্ভিস ও বাংলাদেশ দুর্যোগ ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে সারাদেশে গার্মেন্ট-বস্তি-মার্কেটে ছোট বড় মিলিয়ে সহস্রাধিক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। তবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৫০টির মতো। এরমধ্যে গুলশান ও এর কাছাকাছি এলাকায় পরপর কয়েকটি অগ্নিকাণ্ড জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে। অনেকের প্রশ্ন, কেন ঘুরেফিরে সেসব জায়গাতেই আগুন লাগছে যেসব জায়গায় উচ্ছেদের প্রয়োজনের কথা প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে বলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিএনসিসি মার্কেট ভেঙে সাত বিঘার ওপর ১৮ তলা ভবন নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা চলছে। মার্কেটের দোকান মালিকদের পুনর্বাসনের কোনও ব্যবস্থা না থাকায় তারা আদালতের আশ্রয়ও নিয়েছেন। তাদের দাবি, উচ্ছেদ করতে অতীতে কয়েকবার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি উচ্ছেদের কথা জানানোও হয়েছে তাদের।
গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড ‘পরিকল্পিত নাশকতা’ নাকি ‘দুর্ঘটনা’ তা খতিয়ে দেখতে ফায়ার সার্ভিস ও ডিএনসিসির সমন্বয়ে ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে শুরুতেই ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের ‘এটা নাশকতা নয়, দুর্ঘটনা’ মন্তব্য কিছুটা হলেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির নেতা শেখ হুমায়ুন কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পরপরই ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক এটা নাশকতা নয় বলেছেন। এরপর তদন্তে আর ভিন্ন কী বের হতে পারে!’
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক (ওয়্যারহাউজ) শামীম চৌধুরী অবশ্য এমন সন্দেহ উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রশ্নই ওঠে না। কমিটি যা পাবে তাই বলবে।’
/এএআর/আপ-এআর/