বাংলাদেশে অবস্থিত মিয়ানমারের সকল অবৈধ নাগরিককে ফেরত নেওয়ার জন্য কড়াভাবে আহ্বান জানাবে সরকার। মিয়ানমারের বিশেষ দূত ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ইউ কিও তিন এর সঙ্গে আগামীকালের (বুধবার) বৈঠকে এই আহ্বান জানানো হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ইউ কিও তিন মঙ্গলবার ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন। আগামীকাল বুধবার পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকের সঙ্গে তিনি আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার কারণে বাংলাদেশ ভুক্তভোগী।এই সমস্যার সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে এবং এর সমাধান হচ্ছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদেরকে নাগরিক অধিকার দেওয়া।
তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে এবং ১৯৯২ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রায় সবাইকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। তখন দুদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে মিয়ানমার স্বীকার করে নিয়েছিল রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আইনগত নাগরিক।
গত তিন দশকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে এবং তারও আগে থেকে তিন থেকে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা আগেই মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসে বসবাস করছে। গত অক্টোবর মাসে নতুন করে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর হামলা শুরু হলে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে।
গত ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কাছে পুলিশ চৌকিতে আক্রমণে কয়েকজন পুলিশ নিহত হওয়ার তিন মাস পর বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার জন্য মিয়ানমার ঢাকায় তাদের প্রতিনিধি পাঠায়।
এ আলোচনার জন্য মিয়ানমার কতটা আন্তরিক জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, গত নভেম্বরে মিয়ানমার-চীন সীমান্তের শান প্রদেশে পুলিশ চৌকিতে আক্রমণ হয় এবং এর এক সপ্তাহের মধ্যে দেশ দুটির মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গত তিনমাসে এ ধরনের বৈঠকে মিয়ানমার কোনও আগ্রহ দেখায়নি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অং সান সু চি মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তিনি গত তিনমাসে অনেক দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে একবারের জন্যও সময় দেননি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিঠি হস্তান্তরের সময়েও তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে সময় দেননি।
এমন পরিস্থিতিতে বুধবারের আলোচনায় কোনও ইতিবাচক ফল আসবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাখাইন প্রদেশে ধর্মীয় কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সোচ্চার হলে অং সান সু চি-র নেতৃত্বাধীন সরকারের টনক নড়ে।
আগামী ১৯ জানুয়ারি শুধুমাত্র রোহিঙ্গা বিষয়ে মালয়েশিয়ায় ওআইসি-র পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আছে এবং সেখানে এ বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আলোচনা চলছে।
এছাড়া গত ডিসেম্বরে রোহিঙ্গা নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পার্লামেন্ট সর্বসম্মত একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। মিয়ামারের প্রতিবেশী এবং আসিয়ানের সদস্য মালয়েশিয়া প্রকাশ্যে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা নির্যাতনের জন্য দায়ী করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে এবং বাংলাদেশও এর সঙ্গে আছে।
তিনি বলেন, ১৯৭৮, ১৯৯২ এবং এমনকি ২০১২ সালে যে প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনী পুরনো কৌশল পাল্টে বর্তমানে নতুনভাবে তাদের ওপর নির্যাতন করছে।
বর্তমানে তারা রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন চালাচ্ছে। তাদের ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে এবং এর মাত্রা এত বেশি যে,রোহিঙ্গারা নির্যাতন সইতে না পেরে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০১৬ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারের ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর হাতে ছিল। কিন্তু এখন এ ক্ষমতা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে, অথচ এই সরকারই তাদের দেশের লোকদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে।
বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয়ভাবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করে যাবে বলে জানান তিনি।
এপিএইচ/