বেপরোয়া ড্রাইভিং!

মদ্যপ অবস্থায় বাজি ধরে রেস করতে গিয়ে, কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে কেবল মজা করতে অনিয়ন্ত্রিত গতিতে বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের শিকার হচ্ছেন পথচারী থেকে শুরু করে ফুটপাতের সাধারণ মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) ১৪ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারান পথচারীরা। এসব দুর্ঘটনার ৯১ শতাংশই ঘটে অতিরিক্ত গতিতে বেপরোয়া যানবাহন চালানোর কারণে।

রাতে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা বলছেন, অহরহ চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। নিহত হলে খবর হয়, আহতদের ক্ষেত্রে হয় না। বেপরোয়া চালকদের বেশিরভাগই উচ্চবিত্তের ‘বখে যাওয়া’ সন্তান উল্লেখ করে তারা বলছেন, এদের কেউ কেউ দুর্ঘটনার পর আটক হলেও শেষ পর্যন্ত বিচার না হওয়ায় এই প্রবণতা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত সোমবার (৯ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে তেমনই একটি ঘটনার শিকার হন দৈনিক প্রথম আলোর ফটোজার্নালিস্ট জিয়া ইসলাম। রাজধানীর পান্থপথে পেছন থেকে বেপরোয়া গতিতে তাকে গাড়ি চাপা দেন মডেল কল্যাণ কোরাইয়া। মারাত্মক আহত জিয়াকে হাসপাতালে নেওয়া দূরে থাক, গাড়ির লাইট নিভিয়ে দু’জন প্রত্যক্ষদর্শীকে ফাঁকি দিয়ে দ্রুতগতিতে পালিয়ে যান এই মডেল। মঙ্গলবার এ ঘটনায় কোরাইয়ার জড়িত থাকার কথা প্রকাশ পেলে শুরু হয় তার পক্ষে দেনদরবার। পুলিশ বলছে, তার পক্ষে যারা কথা বলছেন, তাদের নামের তালিকা শুনলেও মানুষ হতবাক হয়ে যাবে।মামলা না করে ফারিজকে বাসায় পৌঁছে দেয় পুলিশ

একইরকম ঘটনা ঘটে ২০১৫ সালের অক্টোবরে রাজধানীর গুলশানে। কিশোর ফারিজ রহমানের বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ে তিনজন পথচারী-রিকশাওয়ালা গুরুতর আহত হন। কিন্তু দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, সাবেক এক এমপি’র ভাতিজা হওয়ার কারণে সেই ঘটনায় পুলিশও এগিয়ে আসতে চায়নি। বরং ঘটনাস্থল থেকে ফারিজকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয় পুলিশ হেফাজতে এবং মামলা না করেই তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়।

জাতিসংঘে বাংলাদেশসহ সদস্যদেশগুলো ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশে এই প্রবণতা বাড়ছেই। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার নামে যা ঘটছে, তাকে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি জানায়, ২০১৬ সালে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা চার হাজার ৩১২টি। এসব দুর্ঘটনায় ছয় হাজার ৫৫ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছে।

এদিকে অভিজাত এলাকায় পুলিশের ব্যাপক নিরাপত্তা সত্ত্বেও প্রায় প্রতিদিনই চলে গাড়ির রেসিং। এতে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে উল্টো পুলিশকেই চাপে থাকতে হয়। এ সম্পর্কে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গুলশানে এ ধরনের (রেস) ঘটনা থামেনি এবং এদের কিছু বলার উপায়ও নেই। প্রভাবশালীদের চাপ আছে।’ গুলশানের আরও কিছু অনিয়ম নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে কত কিছুই ঘটছে। কিন্তু কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না।’

রাত সাড়ে এগারোটার পর দুয়েকটি জায়গা ছাড়া রাজধানীর কোনও রাস্তায় কোনও ট্রাফিক পুলিশকে দেখা যায় না। গত রবিবার (৮ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে রাজধানীর ব্যস্ততম সবক’টি সিগন্যাল ঘুরে দেখা গেছে, সব গাড়ি নিজেদের মর্জিমতো চলছে। কেউ সিগন্যাল মানছে না। কোনও ট্রাফিক পুলিশও নেই। খামার বাড়ির সিগন্যালের এপাশ-ওপাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে ছুটে চলা গাড়ি দেখিয়ে সংসদ ভবনের সামনের রাস্তায় নাইট ডিউটিতে থাকা পুলিশ সদস্য মো. আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই মোড়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। গভীর রাতে পার্টি করে বাড়ি ফেরার সময় প্রাইভেট কারগুলো বেপরোয়া চালানোয় রিকশাচালকরা এই রাস্তায় নামতে ভয় পায়।’

এদিকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার এলেনবাড়িতে বিআরটিএ কার্যালয়ে সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ে এক পর্যালোচনা সভায় সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘চালকদের বেপরোয়া ড্রাইভিং ও দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোই সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।’ ওই সভার এক সপ্তাহের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ, দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি চালকসহ সব কারণ বাস মালিক সংগঠন নেতারা উপস্থাপন করার কথা থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।নভো থিয়েটারের সামনে ফাঁকা চেকপোস্ট

কেবল প্রাইভেট কারই নয়, মোটরবাইকের কারিশমা দেখাতে গিয়েও প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে দুর্ঘটনা। একজনকে বাইক চাপা দিয়ে হত্যার পরও থেমে নেই মতিঝিল এজিবি কলোনিতে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টিকারী বাইক রাইড প্রতিযোগিতা। ধানমন্ডি, উত্তরাতেও আছে এমন গ্রুপ। এসব এলাকার বাসিন্দারা মনে করেন, কেবল ‘অভিজাত বখাটে’ হওয়ার কারণেই এরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সড়ক দুর্ঘটনায় বিচার না হওয়া এবং থানায় অভিজাতদের চাপ ও টাকা লেনদেনের মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া প্রশ্নে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সক্রিয় লেখক-গবেষক-সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা গত কয়েকবছরে আমাদের সম্পদ হারিয়েছি সড়ক দুর্ঘটনার কারণে। এগুলোকে আর দুর্ঘটনা বলা ঠিক না। এগুলো নিশ্চিতভাবে হত্যাকাণ্ড। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও বেপরোয়া চালকরা সেটা করছেন এবং একজন মানুষকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ফেলে দিচ্ছেন।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার বড় অংশই ঘটে চালকের অসতর্কতা ও বেপরোয়া গাড়ি চালনার জন্য। এমনকি ফুটপাতে গাড়ি উঠিয়ে দেওয়ার মতো যে ঘটনাগুলো ঘটে, সেগুলো কেবল চালক অসচেতন ও বেপরোয়া হলেই সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাজধানীর রাস্তা সচরাচর ফাঁকা পাওয়া যায় না। হঠাৎ ফাঁকা পাওয়া গেলে অধিকাংশ চালকই অস্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারান।’

আরও পড়ুন- 


রাষ্ট্রপতির চিঠির অপেক্ষায় আরও অনেক দল