ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বর্ণমালা রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। তারা নিজ ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদেরকে লেখাপড়া করতে হয় বাংলা ও ইংরেজি ভাষায়। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষরা বলছেন, নিজ ভাষায় শিক্ষা নেওয়ার অধিকার না থাকায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে তাদের বর্ণমালা। এমনকি বর্তমানে তাদের মুখের ভাষাতেও বাংলা শব্দের ব্যবহার প্রচুর। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যত প্রজন্ম হয়তো কথ্যভাষাও ভুলে যাবে।
এ বছর প্রথমবারের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পার্বত্য এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের হাতে এখনও বই পৌঁছায়নি। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক ও নারী অধিকার কর্মী মুক্তাশ্রী চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাঙামাটি শহরসহ আশেপাশের এলাকায় বইয়ের হদিশ পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাহাড়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা দানের ফলে এখানকার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় লাভবান হবে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে সংখ্যায় যারা কম, তারা হবে না। কারণ যে স্কুলে ১০ জন চাকমার বিপরীতে একজন মারমা শিশু লেখাপড়া করে, সেই স্কুলে মারমা শিক্ষার্থীর জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার আলাদা ব্যবস্থা করা হবে না। মারমা শিশু লেখাপড়া করে, সেই স্কুলে মারমা শিক্ষার্থীর জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার আলাদা ব্যবস্থা করা হবে কি হবে না সে ব্যাপারেও সরকারের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত কোনও দিকনির্দেশনার কথা আমরা শুনিনি।'
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ১৯৫৭ সালের ৫ জুন ৪০তম অধিবেশনে ১০৭ নং কনভেশনে আদিবাসী ও উপজাতীয় ভাষা বিষয়ে প্রাধান্য দিয়ে কিছু নীতিমালা তৈরি করে। বাংলাদেশ এ কনভেশনে স্বাক্ষর করা অন্যতম দেশ। কনভেশনের ২৩(১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের তাদের মাতৃভাষায় পড়তে ও লিখতে শিক্ষা দান করতে হবে। কিংবা যেখানে এটা সম্ভব নয়, সেখানে তাদের সমগোত্রীয়দের মধ্যে সাধারণভাবে বহুল প্রচলিত ভাষায় শিক্ষা দান করতে হবে।’ অনুচ্ছেদ ২৩(২)এ উল্লেখ রয়েছে, ‘মাতৃভাষা বা আদিবাসী ভাষা থেকে জাতীয় ভাষা কিংবা দেশের একটি অফিসিয়াল ভাষায় ক্রমান্বয়ে উত্তরণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
কিন্তু এর সঠিক প্রয়োগ এখনও সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী ইলিরা দেওয়ান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছোটবেলায় নিজের বর্ণমালায় পড়া তো দূরে থাক, বর্ণমালা শেখানোও হয়নি আমাকে। যে কারণে এখন নিজের বর্ণমালায় লেখার প্রসঙ্গ আসলে কুঁকড়ে যাই। তবে আমার মনে হয়, এজন্য আমি বা আমরা দায়ী নই। বাংলা আমার মাতৃভাষা নয়, এজন্য আমাকে সিক্স/সেভেন পর্যন্ত সংগ্রাম করে বাংলা শিখতে হয়েছে। আমি মনে করি, নিজের ভাষায় পড়ার সুযোগ হলে আমাদের মেধা আরও সুন্দরভাবে বিকশিত হতে পারতো।’
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আলী অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা নতুন একটি প্রতিষ্ঠান। ধীরে ধীরে সবই করা হবে।’ সংখ্যাগুরুদের ভাষা সবসময়েই আধিপত্যশীল কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ভাষিক ঔপনিবেশিকতা যুগে যুগেই ছিল।’
আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষক মেসবাহ কামাল বলেন, ‘বৃহত্তর যোগাযোগের জন্য সংখ্যালঘু ভাষাভাষীকে সংখ্যাগুরুদের ভাষা শিখতেই হয়। কিন্তু বাংলাদেশে যে বাংলা ছাড়াও আরও অনেক ভাষা রয়েছে, তার খবর সাধারণ মানুষ জানে না৷ বাংলাদেশে যে বহু জাতি ও বহু ভাষার মানুষ রয়েছে, সেটা সংবিধানে প্রতিফলিত হয়নি৷’ বাংলাদেশে ১৩/১৪টি ভাষা এমনই শোচনীয় পর্যায়ে রয়েছে যে, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এদের বেশ কয়েকটি হারিয়ে যাবে।’
/ইউআই/এএআর/আপ-এমডিপি/