ইন্টার্নদের হাতে আন্দোলনের অস্ত্র তুলে দেওয়া হলো কেন?

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আন্দোলনতুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক রোগীর স্বজনদের মারধরের ঘটনায় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের চার শিক্ষানবিশ চিকিৎসকের ইন্টার্নশিপ ৬ মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে শজিমেক সহ কয়েকটি মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্নরা কর্মবিরতি পালন করছেন। আর তাতে ভোগান্তিতে পড়েছেন চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ। চিকিৎসক নেতাদের অভিমত, মূল সমস্যার সমাধান না করে ইন্টার্নদের হাতে আন্দোলনের অস্ত্র তুলে দেওয়া ঠিক হয়নি।

ইন্টার্নদের এই আন্দোলনকে ‘দুঃখজনক’ বলে অভিহিত করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বলেছেন, ‘রোগীদের জিম্মি করে ধর্মঘট পালন কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা ইন্টার্নদের ভাতা বাড়িয়েছি। রোগীর স্বজনদের ওপরে যারা হামলা করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারবেন। রোগীদের জিম্মি করে যে ধর্মঘটে যাবে, তাকে আমি গ্রহণ করবো না। তা সে কর্মী হোক বা কোনও চিকিৎসক।’

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (শিক্ষা ও উন্নয়ন) ডা. মো. আব্দুর রশীদ বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদফতর মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। মন্ত্রণালয় যে অবস্থান নিয়েছে আমরাও তার সঙ্গে একাত্ম। রোগীদের যেন কোনও দুর্ভোগ না হয় এবং তারা যেন সেবা বঞ্চিত না হয় সে বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইতোমধ্যে এসব হাসপাতালের পরিচালকদের নির্দেশ দিয়েছেন।’

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই মাহবুব ব্যাপারটা এতদূর গড়ানোর কারণে ক্ষুব্ধ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইন্টার্ন চিকিৎসক এবং অভিযোগকারী রোগীর স্বজনদের মধ্যেই ফয়সালা করা সম্ভব ছিল। দেয়ার ইজ সামথিং এবং সেটাই স্পার্ক হয়েছে। কিন্তু যা হওয়ার হয়েছে, এখন চিকিৎসার স্বার্থে যতো তাড়াতাড়ি এর সমাধান করা যাবে ততোই মঙ্গল।’

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপকে অনভিপ্রেত উল্লেখ করে ড. রশীদ আরও বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে কেন এ বিষয়ে অ্যাকশন নিতে হবে সেটা আমার বোধগম্য নয়। ওরা (ইন্টার্ন চিকিৎসকরা) তো মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। তারা চাকরি করছেন হাসপাতালের অধীনে। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের নিয়োগ দেয় হাসপাতালের পরিচালক। মন্ত্রণালয় এর সমাধান করতে পারতো, কিন্তু তা না করে ডাক্তারদের হাতে আন্দোলনের অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটা কেন হলো? মন্ত্রী সাহেব এ বিষয়ে কেন এতো ইনভলভ হলেন? এটা তো নির্ধারিত হাসপাতালই ফয়সালা করতে পারতো। চিকিৎসকরা তো কতো মার খায়, তখন তো তাকে (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) আমরা এমন অ্যাকশন নিতে দেখি না।’

দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মানববন্ধনবাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার জানা মতে, বগুড়ার মেডিক্যাল কলেজটির সঙ্গে আরও বেশ কয়েকটি মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করছে। তবে এর কারণে কোনও হাসপাতালে চিকিৎসা সেবায় কোনও ব্যাঘাত ঘটছে না।  

তিনি আরও বলেন, ‘এরা ইন্টার্ন চিকিৎসক, অর্থাৎ এরা এখনও প্রশিক্ষণরত। তাদের এ প্রশিক্ষণ কারিকুলামের একটি অংশ। দে আর নট রেজিস্টার্ড ফিজিশিয়ান ফর প্র্যাকটিস। অন্য ফিজিশিয়ানদের সঙ্গে এদের তুলনা করা ঠিক নয়।’

ধর্মঘটের ব্যাপারে ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. ফারহান জানিয়েছেন, তাদের দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবেই তারা তিন দিনের কর্মবিরতি পালন করছেন। এর মধ্যে তাদের দাবি পূরণ না হলে পরবর্তীতে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেন জানান তিনি।

নর্থ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজে মানববন্ধনপ্রসঙ্গত, সিরাজগঞ্জের এক রোগীর স্বজনদের মারধরের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গত ১ মার্চ শজিমেকের অভিযুক্ত চার ইন্টার্ন চিকিৎসকের ইন্টার্নশিপ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। ছয় মাস পর তারা অন্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ শেষ করবে বলেও জানানো হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে। এর প্রতিবাদে ২ মার্চ সন্ধ্যা থেকে অঘোষিত কর্মবিরতি শুরু করেছেন শজিমেকের ইন্টার্নরা। পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ, দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ, সিরাজগঞ্জের নর্থ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ এবং বরিশালের শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম)। রবিবার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সংগঠন ইন্টার্নি চিকিৎসক পরিষদ (ইচিপ)।  চার ইন্টার্ন চিকিৎসকের শাস্তি প্রত্যাহারের দাবিতে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে সংগঠনটি।

এএআর/  

ছবি : আমিনুল ইসলাম বাবু, বিপুল সরকার ও আমিনুল ইসলাম রানা