‘তিন বছর আগে প্রথম সন্তান মারা গেছে। দ্বিতীয়বার মা হওয়ার ১৮ দিন পর ছেলের অস্বাভাবিকতার কারণে ওর বাবা তালাক দেয় আমাকে। শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে আসতে বাধ্য হই। আমার বাবা দিনমজুর। আমরা চার বোন। অনেক সময় নিজেরাও খেতে পায় না। দেড় বছর ধরে সেখানে আমি এ ছেলেকে নিয়ে আছি। এ সন্তানকে আমি বয়ে বেড়াবো কী করে?’- স্বাভাবিকের চেয়ে বড় আকৃতির মাথা নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশু হাসানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কথাগুলো বলছিলেন মা শারমীন। তার চোখে কোণে জমা বিন্দু বিন্দু জল।
শারমীনের বয়স ১৮-১৯ বছর হবে। এই বয়সেই শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। কিন্তু হাল ছাড়েননি। ছেলের উন্নত চিকিৎসার জন্য সাতক্ষীরার তালা থানা থেকে রবিবার (৫ মার্চ) ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে এসেছেন শারমীন। সোমবার (৬ মার্চ) সেখানে গেলে দেখা যায়, ছেলেকে কোলে নিয়ে পায়চারী করছেন তিনি।
ছেলের অসুস্থতার কথা জানিয়ে শারমীন বলেন, ‘জন্মের প্রথম দিকে ওর অবস্থা ভালোই ছিল। কিছু বুঝতে পারিনি। কিন্তু কয়েকদিন পর থেকে দেখলাম ওর মাথা অস্বাভাবিকভাবে বড় হচ্ছে! তখন তার বাবা বলে, এ ছেলেকে চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা দরকার হবে। সে টাকা দিতে পারবে না। ছেলের এ অবস্থার জন্য দোষারোপ করে আমাকে তালাক দেয়। তারপর থেকে আমার বাবার বাড়িতে আছি। কিন্তু টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারিনি। এলাকার কবিরাজ ছেলেকে দেখে চিকিৎসা দিয়েছেন। কিন্তু কোনও উন্নতি হয়নি। দিন দিন মাথা বড়ই হচ্ছে। এখন এত বড় হয়েছে যে মাথার চামড়া ফেটে যাচ্ছে।’
এদিকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক নিউরোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও শিশুটির চিকিৎসক ডা. শেখ মুহাম্মদ একরামুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বিস্তারিত বলেছেন। তিনি জানান, শিশুটি এ ত্রুটি নিয়েই জন্মেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এ রোগকে বলা হয় হাইড্রোসেফালাস।
ডা. শেখ মুহাম্মদ একরামুল্লাহ বলেন, ‘শারমীনের বাচ্চার মতো এত বড় মাথা নিয়ে দেরি করে কেউ আসেনি। সময়মতো সঠিক চিকিৎসকের কাছে না এসে কবিরাজ বা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের কাছে গেলে দিনের পর দিন অবহেলিত হয়ে মাথা অনেক বড় হয়ে যায়। শারমীনও অনেক দেরি করে ফেলেছে। শিশুটি অবহেলিত হয়েছে। আর কবিরাজের কাছে চিকিৎসা নিয়ে তার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। অপচিকিৎসার শিকার হয়েছে সে।’
শিশুটির মাথায় পানি জমে এত বড় হয়েছে এবং সেই পানি নিঃসরণের কোনও পথ তৈরি হয়নি বলে জানালেন এই অধ্যাপক। শিশুটির কোনও ইনভেস্টিগেশন এর আগে হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আজ থেকে ওর চিকিৎসা শুরুর প্রথম ধাপ হিসেবে সিটিস্ক্যান, সিবিসি, ব্লাড গ্রমিংসহ অনেক পরীক্ষা করা হচ্ছে। পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেলে আগামী সপ্তাহ নাগাদ অস্ত্রোপচার করা হবে।’
তবে অস্ত্রোপচার করা হলেও শিশুটির মাথা আর কখনও স্বাভাবিক আকৃতির হবে না জানিয়ে চিকিৎসক বলেছেন, ‘ওর মাথার ভেতরের সব হাড় বড় হয়ে গেছে। এ কারণে মাথা ছোট করা যাবে না। তবে আর বড়ও হবে না। জন্মানোর সময় একটা শিশুর স্বাভাবিক মাথার আকৃতি হয় ৩৫ সেন্টিমিটার। ছয় মাসে সেটা রূপ নেয় ৩৯ সেন্টিমিটারে। এক বছর পর তা হয় ৪৫ সেন্টিমিটার। সেই হিসাবে ওর মাথার পরিধি থাকার কথা ছিল ৪৭ সেন্টিমিটার বা তারও কম। কিন্তু ওর মাথার পরিধি ৬৯ সেন্টিমিটার।’
হাসপাতাল থেকে শিশুটির চিকিৎসাখরচ বহন করা হবে বলেও বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন ডা. একরামুল্লাহ। এজন্য কিছুটা স্বস্তি পেয়ে শারমীন বললেন, ‘চিকিৎসকরা টেস্ট করাতে দিয়ে গেছেন বেশ কয়েকটি। তারা খুব আন্তরিক।’
/জেএ/জেএইচ/