লালবাগের শহীদনগরের এক নম্বর গলি অত্যন্ত ঘিঞ্জি। গলিটি দিয়ে সারাক্ষণ অজস্র মানুষ চলাফেরা করে। এ গলির ১৩৫/২ নম্বর হোল্ডিংয়ে একটি টিনশেড ঘরে রয়েছে ইউনিক পলিমার নামের একটি কারখানা। রবিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, এই কারখানার ভেতরে তরল কেমিক্যাল মজুদ করে রাখা হয়েছে। এই কেমিক্যাল দিয়ে জুতা তৈরির সলিউশন বা আঠা সহ বিভিন্ন ধরনের দাহ্য পদার্থ তৈরি হয়। আগুন লেগে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও অগ্নি প্রতিরোধের তেমন কোনও ব্যবস্থা নেই কারখানাটিতে।
পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোর বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শহীদনগরের ইউনিক পলিমারই শুধু নয়, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ হাজারো কারখানা বা গুদাম ছড়িয়ে আছে। এগুলো কারখানা নয়, দোজখ হয়ে আছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, পুরান ঢাকায় অনেক রাসায়নিক কারখানা এবং গোডাউন রয়েছে। এগুলো থেকে আগুন লেগে অনেক মানুষ মারা গেছে। জননিরাপত্তার জন্য হুমকি এমন কারখানা শহরের ভেতর থাকতে দেওয়া হবে না। এগুলো না সরা পর্যন্ত আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত চলমান থাকবে।
মেজর শাকিল নেওয়াজ জানান, ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পুরান ঢাকায় জরিপ পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনটি টিমে বিভক্ত হয়ে কর্মকর্তারা এ জরিপ করছেন। এ পর্যন্ত লালবাগ ও মিটফোর্ড এলাকার ২৪ ও ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে জরিপ শেষে ৩৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল কারখানা ও গুদাম শনাক্ত করা হয়েছে। পুরো জরিপ শেষ হলে ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। শহীদনগর পড়েছে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডেই।
জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা, গুদাম ও দোকানের বেশির ভাগই রয়েছে পুরান ঢাকার লালবাগ, ইসলামপুর, ইসলামবাগ, শহীদনগর, আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, চকবাজার, কামরাঙ্গীরচর সহ আশপাশের এলাকায়। এগুলোর বেশির ভাগেরই সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন নেই।
এসব গুদামে রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোইল ইত্যাদি। আগুনের সংস্পর্শে এলে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে এসব রাসায়নিক পদার্থ।
অগ্নিপ্রতিরোধক ব্যবস্থা না থাকায় ইউনিক পলিমার কারখানায় রবিবার দুপুরে অভিযান চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। তার আগেই অবশ্য পালিয়ে যান কারখানার মালিক আবদুল করিম সেন্টু। তবে ধরা পড়েন কর্মচারী কোবাদ আলী।
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানজিলা কবির জানিয়েছেন, ইউনিক পলিমারে প্রয়োজনীয় অগ্নিপ্রতিরোধক ব্যবস্থা নেই। লাইসেন্স প্লাস্টিক কারখানার হলেও এই কারখানায় তরল কেমিক্যাল মজুদ করে রাখা হয়েছে। অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩ অনুযায়ী, কারখানা মালিককে ২ লাখ টাকা জরিমানা ও কর্মচারীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীর এক রাসায়নিক গুদামে মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডে ১২৮ জন নিহত এবং দগ্ধ হন শতাধিক মানুষ। এরপর সরকারের বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে বারবার এ ধরনের কারখানা বা গুদাম সরানোর নির্দেশ দেওয়া হলেও কেউই তা গ্রাহ্য করছে না।
ওএফ/এএআর/