সরেজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশের জন্য ৬টি গেট থাকলেও যাত্রীদের জন্য উন্মু্ক্ত রাখা হচ্ছে দুই থেকে তিনটি গেট। ফলে ব্যস্ত সময়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে যাত্রীদের। আর যাত্রীদের এমন লাইনে দাঁড় করানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে চলে ‘লাইন বাণিজ্য’।
রাতে দেখা যায়, গেটের বহির্গমন টার্মিনালের লাইটে সমস্যা থাকায় তা ঠিক মতো জ্বলছে না। আবার, ড্রাইভ ওয়েতে কুকুর বসে থাকায়, যা দেখে অনেক যাত্রী ভয় পান। কোথাও কোথাও টাইলস ভাঙা থাকায় ট্রলি নিয়ে হোঁচট খান যাত্রীরা। দুটি টার্মিনালে গেট ৬টি হলেও ফ্লাইট শিডিউল ডিসপ্লে মনিটির মাত্র দুটি। তথ্য সহায়তার জন্য নেই কোনও ব্যক্তি বা তথ্যকেন্দ্র। বিমানবন্দরে লাগেজ বহনে পর্যাপ্ত ট্রলি থাকলেও ট্রলি পেতে দুর্ভোগ পড়তে হয় যাত্রীদের।
গত ৯ থেকে ১১ মার্চ রাতে সরেজমিন দেখা গেছে, বিমানবন্দরের বহির্গমন ড্রাইভওয়ের দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবেশ করেই তিন নম্বর গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশের জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছেন যাত্রীরা। ৪ ও ৬ নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশের সুযোগ থাকলেও যাত্রীরা না জানার কারণে তিন নম্বর গেটের লাইন বেশি দীর্ঘ হয়। তিন নম্বর গেটে ভিড় বেশি থাকলেও বিমানবন্দরের কোনও কর্মকর্তা বা কর্মচারী যাত্রীদের অন্য গেট ব্যবহারের তথ্য দিচ্ছেন না। বরং ট্রলিম্যান ও আনসার সদস্যরা এই ভিড়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে টাকা নিচ্ছেন যাত্রীদের কাছ থেকে। যাত্রীরা দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবেশ করলেও ট্রলির নেই সেখানে, বরং উত্তর দিকে পড়ে আছে শত শত ট্রলি।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, সকাল ৭ টা থেকে দুপুর ১২ টা এবং সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত বেশ চাপ থাকে বিমানবন্দরে। এসময়ে সব চেয়ে বেশি ফ্লাইট ওঠানামা করে। এছাড়া, ফ্লাইট ছাড়ার এক ঘণ্টা আগেই বন্ধ হয় চেক ইন কাউন্টার। চেক ইন কাউন্টার বন্ধ হওয়ার আগেই বোর্ডিং পাস না সংগ্রহ করতে পারলে ফ্লাইট ছাড়ার আগে এলেও উড়োজাহাজে উঠতে পারবেন না যাত্রীরা। বহির্গমনের তিন নম্বর গেটে লাইন বাড়লেও গেটের দায়িত্বে থাকা আনসার, এ্যাভসেক, এপিবিএন সদস্যদের কেউ বলছেন না সামনে আরও দুটি গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব। ফলে অনেক সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে চেক ইনের নির্ধারিত সময়ে ভেতরে যেতে পারছেন না যাত্রীরা।
গত ১১ মার্চ রাত ১০টা ৪৯ মিনিটে আনসার সদস্য রুবেল লাইন ছাড়া ভেতরে নিতে পারবেন বলে এক যাত্রীকে প্রস্তাব দেন। তিনি সেই যাত্রীকে স্টাফ গেট দিয়ে ভেতরে পাঠানোর জন্য নিয়ে গেলেও এপিবিএন সদস্যদের তৎপরতায় তা সম্ভব হয়নি। তবে চার নম্বর গেটে দিয়ে সে যাত্রীকে ভেতরে পাঠিয়ে টাকা নেন রুবেল।
রাত ১০টা ৩০ মিনিটে স্টাফ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আনসার সদস্য রুবেল আরেক যাত্রীকে টাকার বিনিময়ে লাইন ছাড়াই ভেতরে প্রবেশ করার ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে রুবেলকে হতাশ করেন সেই যাত্রী, জানান তিনি টাকা দিয়ে ভেতরে ঢুকবেন না।
প্রায় একই সময়ে তিন নম্বর গেটে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রীকে আগে ভেতরের যাওয়ার ব্যবস্থা করার ইঙ্গিত দিয়ে টাকা চান আরেক আনসার সদস্য। গেটের কাছে নিয়ে আসার পর ওই যাত্রী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আবারও তাকে ধমকে লাইনের শেষে ঠেলে দেন আনসার সদস্যটি। বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পড়া থাকায় তার নেম প্লেট দেখা যায়নি। তবে লাইনে দাঁড়ানো যাত্রীরা অভিযোগ করেন, নিরাপত্তা কর্মীরাই তাদের দ্রুত ভেতরে পাঠানোর কথা বলে টাকা পয়সা দাবি করছে, যা পৃথিবীর আর কোনও বিমানবন্দরে তারা দেখেননি।
২০১৬ সালের নভেম্বরে বিমানবন্দরের সম্মেলন কক্ষে নিরাপত্তা বিষয়ক এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় বহিরাগমনে বিদেশিরা স্টাফ গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবেন। তবে এখনও সে সুবিধা পাচ্ছেন না বিদেশিরা। অন্যগেটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও বিদেশিদের সাধারণত বলা হচ্ছে না যে তারা স্টাফ গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন। বরং এমন ভিড়ের সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকেও নিরাপত্তাকর্মীরা টাকা চাইছে।
১১ মার্চ রাত পৌনে এগারোটার দিকে দেখা যায়, এক আনসার সদস্য বিদেশি এক নারীকে স্টাফ গেটের ভেতরে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে দেন। সেখানে তৎপর এপিবিএন সদস্যদের কারণে টাকা নেওয়ার সুযোগ না পেয়ে যাত্রীর পিছু পিছু ভেতরে চলে যান সেই আনসার সদস্য। বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরা থাকায় তার নেমপ্লেটও পড়া যায়নি।
ওই রাতেই ১০টা ২০ মিনিটে দেখা যায়, আনসার সদস্য রফিক লাইনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছেন। আরেকটু ভালোভাবে তাকালে স্পষ্ট হয়, তিনি খুঁজছেন ভেতরে টাকা দিতে যেতে ইচ্ছুক যাত্রীদের। যাত্রীদের কাছে বলছেন, টাকা দিলে তিনি লাইন ছাড়াই ভেতরে নিয়ে যেতে পারবেন।
অনিক কুমার একটি বায়িং হাউজের কর্মকর্তা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘৪ মার্চ নেদারল্যান্ড থেকে ঢাকায় ফিরেছি। কনভেয়ার বেল্ট থেকে ব্যাগ হাতে পেয়ে টার্মিনাল-২ দিয়ে যখন বের হবো, তখন এক ব্যক্তি এসে বলেন, ‘স্যার সামনে আরও চেকিং এর ঝামেলা আছে, আমার সঙ্গে আসেন আমি পার করে দিচ্ছি। আমাকে বিশ ইউরো দিলেই হবে।’ তার গলায় আইডি কার্ড ঝোলানো ছিল। এয়ারপোর্টের কোনও দায়িত্বে হয়ত ছিল। আমি তাকে চলে যেতে বলে নিজে একাই বের হয়ে আসি।’’
অনিক কুমার বলেন, দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে আমাদের বায়িং হাউজের একজন পরিচালক আছেন বিদেশি, তাকেও বিমানবন্দরে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। তিনি হংকং গিয়ে আমাকে সব জানালেন। গত ৮ মার্চ আমাদের বায়িং হাউজের পরিচালক উইলিয়াম পিটার ঢাকা থেকে হংকং যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। সেখানে অনেক লম্বা লাইনে দাঁড়ানো পিটার। একজন পুলিশ বা আনসার সদস্য তাকে লাইন ছাড়া টাকা দিয়ে আগে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। তবে পিটার তার প্রস্তাবে রাজি না হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ভেতরে গিয়েছেন।
অনিকের প্রশ্ন, ‘বিমানবন্দরে যারা কাজ করেন তারা কী বোঝেন না তাদের জন্য বিদেশিদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে?’
এ বিষয়ে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক কাজী ইকবাল করিম বলেন, চার পাঁচটা গেটে স্ক্যানার থাকলেও আমাদের লোকবল নেই। যাত্রীদের বেশি চাপ হলে অন্য স্থান থেকে লোক ম্যানেজ করে পিক আওয়ারে এক নম্বর গেট খুলে দেই।
কাজী ইকবাল করিম বলেন, বাংলাদেশে নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে। যে দেশে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকবে, সেখানে বেশি চেক হবে। এছাড়া, আমাদের টার্মিনাল ছোট।
যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া বিষয়টিকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেন হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক কাজী ইকবাল করিম।
এ বিষয়ে জানতে একাধিক বার ফোন করে এবং ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে, পরে বিমানবন্দরের জনসংযোগ বিভাগের মাধ্যমেও চেষ্টা করে সিভিল এভিয়েশন অথরিটির সদস্য (অপারেশন অ্যান্ড প্ল্যানিং) এম মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
/সিএ/টিএন/ আপ-এপিএইচ/