কী হবে হাজারীবাগের জমিতে?

ট্যানারি

রাজধানীর হাজারীবাগে ট্যানারির পরিত্যক্ত জমি কাজে লাগাতে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ট্যানারি কারখানাগুলো চলে গেলে খালি জমিতে নতুন কোনও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়তে দেওয়া হবে না। এখানকার প্রতি ইঞ্চি জমিতে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় সরকার। এরই মধ্যে এ ব্যাপারে একটি খসড়া রূপরেখা তৈরির কাজে হাত দিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়।

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হাজারীবাগের জমিতে আবাসিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা শতভাগ নিশ্চিত করতে বহুতলবিশিষ্ট বহুমুখী বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হতে পারে। এখানে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবনটির ১০ তলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হবে। বাকি তলাগুলো থাকবে আবাসিকের জন্য। ট্যানারির জমিতে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। সেখানে অনুমোদনহীন কোনও স্থাপনা নির্মাণ হতে দেবে না শিল্প মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্র জানিয়েছে, হাজারীবাগকে  আধুনিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর সেখানে কাজ শুরু হবে। তবে ওই অঞ্চলে অনেক ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা রয়েছে। অনেক জায়গার ওপর বিপুল অংকের ব্যাংক ঋণ নেওয়া আছে। সরকার এগুলোকে কিভাবে সমন্বয় করবে, তা এখনও ঠিক হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার হাজারীবাগের ট্যানারির জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করবে, নাকি ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেবে, সেটি এখনও চূড়ান্ত করেনি শিল্প মন্ত্রণালয়। এজন্য মন্ত্রণালয়টি প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা চায়। তবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের করা মহাপরিকল্পনার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করলে তা বাস্তবায়নে শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঢাকা সিটি করপোরেশন যৌথভাবে কাজ করবে। 

এ প্রসঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হাজারীবাগের পরিত্যক্ত জমি ঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য সরকার একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সে লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। মহাপরিকল্পনার কাজ শেষ হলে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব খুব শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলে সেভাবেই গড়ে উঠবে নতুন হাজারীবাগ। কোনোভাবেই এ খালি জায়গায় নতুন কোনও শিল্প স্থাপন করতে দেওয়া হবে না।

শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিক সূত্রে জানা গেছে, হাজারীবাগে ট্যানারি পল্লীর মোট জমির পরিমাণ ৭০ বিঘা। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে প্রথম ট্যানারি শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে চামড়া প্রক্রিয়াজাত শুরু হয়। পরে অনুকূল পরিবেশের কারণে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৪ সালের ২৪ জানুয়ারি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে হাজারীবাগে ট্যানারি পল্লী করার অনুমোদন দেয়। একই সঙ্গে ট্যানারি গড়ে তোলার জন্য হাজারীবাগের ওই ৭০ বিঘা জমির ওপর ট্যানারি শিল্প পল্লীর ‘লে আউট প্ল্যান’ চূড়ান্ত করা হয়।

মাত্র ১৯টি ট্যানারি নিয়ে তখন এ পল্লীর যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রথম দিকে এখানে গড়ে ওঠা কারখানাগুলোর সর্বনিম্ন আয়তন ১০ কাঠা আর সর্বোচ্চ আয়তন ছিল দুই বিঘা। কিন্তু পরে হাতবদলের মাধ্যমে প্লটগুলোর আকার ছোট হতে থাকে। একই সঙ্গে নির্ধারিত জায়গা ছেড়ে কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতেও ট্যানারি শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটে। সত্তরের দশকে জাতীয়করণ হলেও আশির দশকে আবার বেসরকারিকরণ করা হয় ট্যানারি শিল্প। নব্বইয়ের দশকে শিল্পটির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে পরিবেশ দূষণের মাত্রা।

হাজারীবাগকে আধুনিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা প্রসঙ্গে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হাজারীবাগ এলাকার বর্তমান জরাজীর্ণ চেহারা আর থাকবে না। এই এলাকাকে শতভাগ নাগরিক সুবিধা দিয়ে একটি মডেল আবাসিক পল্লী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শিল্প মন্ত্রণালয় সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। তার আগে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হবে। 

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট শাহীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হাজারীবাগ এলাকা থেকে ট্যানারি শিল্প পুরোপুরি চলে যাওয়ার পর এখানে সবুজ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে একটি সুন্দর, পরিকল্পিত অঞ্চল গড়ে তোলা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন হয়তো কিছুটা কঠিন হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ট্যানারি শিল্পের মালিকদের অনেকেরই এখানে নিজস্ব জমি রয়েছে। তাদের ৯০ ভাগই ঋণ নিয়ে জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখেছেন। তাই এখানে অংশীদারিত্বের সংখ্যাও অনেক। এমন অবস্থায় সরকারের যে কোনও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনেকটাই কঠিন।

শাহীন আহমেদ আরও বলেন, গৃহীত পরিকল্পনা সরকার কিসের ওপর ভিত্তি করে বাস্তবায়ন করবে, সেটি পরিষ্কার হওয়া উচিত। জমি অধিগ্রহণে সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা আছে। তবে তা করতে হলে জমির বিপরীতে ট্যানারি মালিকদের নেওয়া বিপুল ব্যাংক ঋণের দায়ও বহন করতে হবে সরকারকে।

হাজারীবাগে স্থায়ীভাবে বসবাস করা একাধিক বাসিন্দা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ঢাকায় এক ইঞ্চি জায়গা বের করাও কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় এত বিপুল পরিমাণ জমি খালি হওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা। সরকারের দৃঢ়তার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। এসব জমির সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন নিশ্চিত করা উচিত। ট্যানারির ময়লা-আবর্জনায় এই এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতেই ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর করা হচ্ছে। আমরা চাই না পরিবেশ আবার প্রতিকূল হয়ে পড়ুক।

 /এসআই/এএআর/আপ-এসটি