শিক্ষায়-চাকরিতে প্রতিবন্ধীরা অবহেলিত!

JMS_Health_156

সমাজসেবা অধিদফতর পরিচালিত জরিপ মতে, দেশে মোট প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা ১৫ লাখ ৯ হাজার ৭১৬ জন। আর প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনগুলো বলছে, প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।দেশের এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষগুলোর জন্য সমঅধিকারের বিষয়টি কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তারা বঞ্চিত ও অবহেলিত।শিক্ষা ও চাকরিতে তারা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

ফারুক হোসেনের বয়স এখন পঁয়ত্রিশ বছর।পাঁচ বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন তিনি।পরিবারের সহযোগিতায় তিনি ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল সোসাইটি ফর দ্যা ব্লাইন্ড’ এর অধীনে পড়াশোনা করেছেন।  ফারুক হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে সমস্যা না হলেও উচ্চ মাধ্যমিক,স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এসে প্রতিবন্ধীদের ভোগান্তি শুরু হয়।কারণ উচ্চ মাধ্যমিক থেকে এর পরের ধাপগুলোতে তাদের উপযোগী বই সহজলভ্য নয়। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী তখন ড্রপআউট  হয়ে যায়।’

পরীক্ষার হলে প্রতিবন্ধীদের জন্য একজন করে ‘রাইটার’ বা ‘শ্রুতিলেখক’ থাকার নিয়ম থাকলেও নির্ধারিত শ্রুতিলেখক যদি কোনও কারণে সহযোগিতা না করতে পারেন, তাহলে সেই শিক্ষার্থীর একটা বছরই নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য তারা দুজন করে শ্রুতিলেখক রাখার দাবি জানালেও সরকার এ বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি বলে আক্ষেপ করলেন ফারুক হোসেন। তবে পরীক্ষায় তাদের জন্য  অতিরিক্ত ২০ মিনিট সময় বরাদ্দ দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

জানা গেছে, সমাজসেবা অধিদফতরের অধীনে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ঢাকা, চট্রগ্রাম, খুলনা, চাঁদপুর, রাজশাহী, ফরিদপুর এবং সিলেটে মোট সাতটি শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। সাতটি বিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা ৬২০টি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আরও  অনেক  বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা দরকার। এর পাশাপাশি মূলধারার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের সেতু তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

অপরদিকে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির চাকরিতে শতকরা ১ শতাংশ এবং অন্যান্য চাকরিতে এতিম ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা নির্ধারিত থাকলেও  এখানে ফাঁকি রয়েছে, অভিযোগ সংশ্লিস্টদের। তাদের মতে, বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন, এতিম এবং প্রতিবন্ধীদের মধ্যে কাকে রেখে কাকে চাকরি দেওয়া হবে।

autizmus

অভিযোগ আছে, যেসব প্রতিবন্ধী চাকরি করছেন তাদেরকে যথাপোযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। তারা কর্মস্থলে ডেস্ক পান না। বিদ্যালয়ে শিক্ষক হয়েছেন, অথচ ক্লাস পাচ্ছেন না।

ফারুক হোসেন বলেন, ‘জীবনে অনেক ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে ভাইবা দিয়েছি। কিন্তু কেবল অন্ধ হবার কারণে তাদেরকে খুশী করতে পারিনি।একবার একটি চাকরির  ইন্টারভিউতে বলেছিলাম, আমাকে একটা সুযোগ দেওয়া হোক। কথা দিচ্ছি আপনাদের সুনাম অক্ষুণ্ন থাকবে। কিন্তু সেই সুযোগ আমি পাইনি।’ আমাদের সুযোগই দেওয়া হয় না, হতাশা নিয়ে বলেন তিনি।

আইনে আছে, সব বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধীদের ভর্তি করানো যাবে। কিন্তু এই নীতি কেবল কাগজেই সীমাবব্ধ, বললেন রিফাত। তিনিও একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী।

রিফাত বলেন,‘আইনে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের কথা বলা হলেও আদতে এর বাস্তবায়ন নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যে শিক্ষণ পদ্ধতি, সেখানে এগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এখনও। কিংবা তাদের প্র্যাক্টিস নেই। যে কারণে  প্রচলিত বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে এসব স্পেশালাইজড শিশুরা বিড়ম্বনার শিকার হয়।’

unnam

সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবেলিটির (সিএসআইডি) নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম বাংলাট্রিবিউনকে বলেন, ‘শ্রবণ প্রতিবন্ধীরা আইসিটি (তথ্য প্রযুক্তি) সেক্টরে খুব ভালো করছে।তারা গার্মেন্ট, লেদার সেক্টর এবং আইসিটি সেক্টরে বেশ ভালো করছে। এখনও যেহেতু এই শিক্ষা ব্যবস্থা মূলধারার এডুকেশন নয়, সরকারি স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষকরা এখনও সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে সেরকম প্রশিক্ষণ পাননি, তাই তাদের সঙ্গে কমিউনিকেশন একটি বড় সমস্যা।’

সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় ভালো করার পরেও প্রতিবন্ধীদের চাকরি না হওয়া নিয়ে উচ্চ আদালতে বিভিন্ন সময় মামলা হয়েছে।সেসব মামলার কয়েকটি এখনও বিচারাধীন।আবার বিসিএস দিয়ে চাকরি হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার পর কাজ দেওয়া হয়নি।মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।এমন ঘটনাও ঘটেছে মন্তব্য করেন খন্দকার জহুরুল আলম।

/এপিএইচ/