রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকা ট্যানারিমুক্ত হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। ট্যানারি শিল্প চলে যাচ্ছে সাভারের হরিনবানন্দা এলাকায় ট্যানারি পল্লীতে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি চলে যাওয়ার পর এই এলাকা কীভাবে ব্যবহৃত হবে যৌথভাবে সেই পরিকল্পনা তৈরি করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়। তবে ট্যানারি মুক্ত হলেও হাজারীবাগের আকাশ, বাতাস, মাটি ও পানি তথা দূষিত পরিবেশ দ্রুতই স্বাভাবিক হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এ বিণয়ে কোনও উদ্যোগ নেয়নি।
হাজারিবাগের বাতাসে উদ্ভট গন্ধ থাকবে আরও অনেকদিন। গন্ধ কবে নাগাদ পুরোপুরি দূর হবে তা জানেন না কেউ। পানি খাওয়া তো দূরের কথা দৈনন্দিন কাজেও ব্যবহার করা যায় না। এ এলাকার আসল মাটি খুঁজে পাওয়া দায়। মাটি খুড়লে স্তরের পর স্তর পাওয়া যায় গরু, মহিষ বা ছাগল ভেড়ার পরিত্যক্ত চামড়া, শিং, হাড়সহ উচ্ছিষ্টাংশ। কয়েক ফুট গভীরে মাটির দেখা মিললেও তাতে দেখা যায় না স্বাভাবিক রঙ। ছাই রঙের এসব মাটির স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা নেই। এখানে কোনও গাছ জন্মায় না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাতাস, পানি ও মাটির কারণেই এখানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ নানা চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। হাঁপানি, যক্ষ্মায়, পেটের পীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত লোকজন। কেউ বা অকালে হারিয়েছেন কর্মক্ষমতা। বেসরকারি কয়েকটি এনজিও এসব নিয়ে কাজ করছে।
আকাশ, বাতাস, মাটি ও পানির এমন বেহাল অবস্থায় হাজারীবাগে আধুনিক শহর গড়ে তোলার সরকারি প্রয়াস কতটুকু সফল হবে তা সংশয় রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাদের খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘আমরা চাই ট্যানারি চলে যাওয়ার পর এখানকার পরিবেশ অন্য এলাকার মতো স্বাভাবিক হোক।’
হাজারীবাগের পরিবেশ উন্নয়নে বা স্বাভাবিক করতে সরকারের পদক্ষেপ আছে কিনা তা জানে না শিল্প মন্ত্রণালয়। একই বক্তব্য দিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। যদিও শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, পরিবেশ উন্নত করা শিল্প মন্ত্রণালয় বা বিসিকের কাজ নয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখনও হাজারীবাগ ট্যানারি শূন্য হয়নি। এখনও সেখানে কাজ চলছে। আগে এলাকাটি পুরোপুরি ট্যানারি মুক্ত হোক ,অন্য দশটি এলাকার মতো গড়ে উঠুক। তারপর দেখা যাবে এখানকার পরিবেশ কতটা ক্ষতিকর। তাছাড়া চামড়া শিল্পের কাজ বন্ধ হয়ে গেলে পরিবেশে স্বাভাবিক নিয়মেই উন্নত হবে। এ নিয়ে এত ভাবনার কিছু নেই।’
পরিবেশ অধিদফতর জানিয়েছে, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি পুরোপুরি চলে যাওয়ার পর কাজ শুরু হবে। সেখানকার পরিবেশ উন্নয়নে একটি পরিকল্পনা গ্রহণের চিন্তাভাবনা রয়েছে সরকারের। এতে সম্পৃক্ত করা হতে পারে অনেককেই। তবে ট্যানারি স্থানান্তরের পরেই তা হবে বলে জানান পরিবেশ অধিদফতরের একজন পরিচালক।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চর্ম বিশেষজ্ঞ ডা. মকবুল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘হাজারীবাগের মাটি, পানি ও বাতাসের প্রভাবে মানবদেহের ক্ষতির বিষয়টি বেশ কিছুদিন থাকবে। পেটের পীড়া, হাঁপানি ও যক্ষ্মার মতো রোগ হবে অনেকদিন। চাইলেই তড়িঘড়ি এর প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া যাবে না। সাবধান থাকতে হবে।’
এদিকে ট্যানারির পরিত্যক্ত জমি কাজে লাগাতে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ট্যানারি কারখানাগুলো চলে গেলে শূন্য জমিতে নতুন কোনও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়তে দেওয়া হবে না। ট্যানারির জমিতে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। সেখানে অনুমোদনহীন কোনও স্থাপনা নির্মাণ হতে দেবে না শিল্প মন্ত্রণালয়।
এখানকার প্রতি ইঞ্চি জমি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় সরকার। এরই মধ্যে এ ব্যাপারে একটি খসড়া রূপরেখা তৈরির কাজে হাত দিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। হাজারীবাগের জমিতে আবাসিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা শতভাগ নিশ্চিত করতে বহুতলবিশিষ্ট বহুমুখী বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হতে পারে বলে শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘হাজারীবাগেরজমি সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য সরকার একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেই লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনার কাজ শেষ হলে একটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। অনুমোদন পেলে সেভাবেই গড়ে উঠবে নতুন হাজারীবাগ।’
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্র জানিয়েছে, হাজারীবাগকে আধুনিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর সেখানে কাজ শুরু হবে। ওই অঞ্চলে অনেক ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা রয়েছে। অনেক জায়গার ওপর বিপুল অংকের ব্যাংক ঋণ নেওয়া আছে। সরকার এগুলোকে কীভাবে সমন্বয় করবে তা এখনও ঠিক হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার হাজারীবাগের ট্যানারির জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করবে নাকি ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেবে, তা এখনও চূড়ান্ত করেনি শিল্প মন্ত্রণালয়। এজন্য তারা প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা চায়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের করা মহাপরিকল্পনার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিলে তা বাস্তবায়নে শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঢাকা সিটি করপোরেশন যৌথভাবে কাজ করবে।
এ প্রসঙ্গে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘হাজারীবাগ এলাকার বর্তমান জরাজীর্ণ চেহারা আর থাকবে না। এই এলাকাকে শতভাগ নাগরিক সুবিধা দিয়ে একটি মডেল আবাসিক পল্লী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।’
হাজারীবাগে ট্যানারি পল্লীর মোট জমির পরিমাণ ৭০ বিঘা। পঞ্চাশের দশকে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে প্রথম ট্যানারি শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে চামড়া প্রক্রিয়াজাত শুরু হয়। অনুকূল পরিবেশের কারণে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৪ সালের ২৪ জানুয়ারি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে হাজারীবাগে ট্যানারি পল্লী স্থাপনের অনুমোদন দেয়। একই সঙ্গে ট্যানারি গড়ে তোলার জন্য হাজারীবাগের ওই ৭০ বিঘা জমির ওপর ট্যানারি শিল্প পল্লীর ‘লে-আউট প্ল্যান’ চূড়ান্ত করা হয়। মাত্র ১৯টি ট্যানারি নিয়ে তখন এ পল্লীর যাত্রা শুরু হয়েছিল।
প্রথম দিকে হাজারীবাগে গড়ে ওঠা কারখানাগুলোর সর্বনিম্ন আয়তন ১০ কাঠা আর সর্বোচ্চ আয়তন ছিল ২ বিঘা। কিন্তু পরে হাতবদলের মাধ্যমে প্লটগুলোর আকার ছোট হতে থাকে। একই সঙ্গে নির্ধারিত জায়গা ছেড়ে কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতেও ট্যানারি শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটে। সত্তরের দশকে জাতীয়করণ হলেও আশির দশকে আবার বেসরকারিকরণ হয় ট্যানারি শিল্প। নব্বইয়ের দশকে শিল্পটির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে পরিবেশ দূষণের মাত্রা।
/জেএইচ/এসটি/