‘ডিপ্রেশন, লেটস টক’ এ প্রতিপাদ্য নিয়ে এবারের স্বাস্থ্য দিবস পালিত হচ্ছে। শুধু কথা বলে ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা কমে না বলেই জানিয়েছেন মনোচিকিৎসকরা। কথার মধ্য দিয়ে তাদের সমস্যাগুলো নতুনভাবে ভাবার সুযোগ পায় বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
৩৫ বছর বয়সী সোহেলী (ছদ্মনাম) দুবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। প্রথমবার স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে এবং দ্বিতীয়বার বাবা-মায়ের সঙ্গে মনোমালিন্য থেকে। কিন্তু দুবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন।
রাকিব (ছদ্মনাম) চাকরি করতেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। ভীষণ রাগী বাবার ভয়েই ছোট থেকে আত্মকেন্দ্রিক রাকিব কারো সঙ্গেই সাবলীলভাবে মিশতে শেখেননি। চাকরিতে সমবয়সীদের এগিয়ে যেতে দেখে নিজেকে আরও আড়াল করতে থাকেন নিজেকে। অসুস্থতার কথা বলে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে মাসের পর মাস বাসায় বসে থাকেন। এক পর্যায়ে চাকরি ছাড়েন এবং ধার করে জীবন কাটাতে থাকেন। সেটিও এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে গেলে মাদকাশক্ত হয়ে পড়েন।
মনোচিকিৎসকরা বলছেন, এ ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে কম-বেশি অনেকেই যায়। কেউ উৎরে যেতে পারে, কেউ পারেন না। তবে সমস্যাগুলো নিয়ে শুরু থেকেই পাশের মানুষের সঙ্গে কথা বললে নিজের ‘ভুল পারসেপশন’গুলো চূড়ান্ত রূপ নিতে পারে না।
তাদের মতে, কেবল কথা বললেই বিষণ্নতা থেকে বেরিয়ে আসা যায় তা নয়। কথা বলার মধ্য দিয়ে যিনি ডিপ্রেশনে আছেন তিনি নিজের সমস্যাগুলো অন্যভাবে দেখার সুযোগ পায়। সেক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পেশাগত জায়গাতেও এমন একটা ডেস্ক থাকা জরুরি যেখানে সে নিজের সমস্যাগুলো আলোচনা করবে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ কোনও না কোনোভাবে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৩০-৪০ বছর বয়সে বিষণ্নতার লক্ষণ প্রথম দেখা যায়, এছাড়াও ১৫-১৮ ও ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এর ঝুঁকি থাকে বেশি। আর শিশুদের মধ্যেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। সারাবিশ্বে প্রতিদিন তিন হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন। এ হিসেবে বছরে আত্মহত্যার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। এর মধ্যে বেশিরভাগ আত্মহত্যা ঘটে বিষণ্নতাজনিত কারণে।
বর্তমান বিশ্বে ডিজিজ বার্ডেন হিসেবে বিষণ্নতার স্থান তৃতীয়। এ কারণে বিষণ্নতার সমস্যা সমাধান এবং সাবর্জনীন সমর্থন অর্জনের জন্য এ বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আসুন, বিষণ্নতা নিয়ে কথা বলি।’
বিশ্বে নারীদের তুলনায় তিনগুণ বেশি পুরুষ আত্মহত্যা করলেও বাংলাদেশে এ পরিসংখ্যানে নারী এগিয়ে। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার হিসাব বলছে- বাংলাদেশে আত্মহত্যাকারীদের ৭০ শতাংশ নারী। যৌতুক, পারিবারিক নির্যাতন ও উত্ত্যক্তকরণের ফলে সে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় ভাবতে গিয়ে এবং সেগুলো নিয়ে কারোর সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে না পারার কারণে এ ধরনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের চিকিৎসক মেখলা সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যারা মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যিাচ্ছে তারা অন্যের সঙ্গে আলাপের মধ্য দিয়ে সমস্যাটাকে চিহ্নিত করার সুযোগ পায়। এ কথা বলার মধ্য দিয়ে তা কেটে যাবে এমনটা না, তবে অপরের সাহায্যের যে বিষয়টা সেটার গুরুত্বটা অনুধাবন হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বন্ধুদের দিক থেকে বিষয়টা হতে পারে, পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলাপেরও দরকার হতে পারে। যে কোনও ধরনের মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যখন কেউ যায় তখন কথা বলার মাধ্যমেই নিজের সমস্যাগুলো অন্যভাবে দেখতে শেষে। কথা বলেই নিজের প্রতি আস্থার জায়গা তৈরি হয়। ডিপ্রেশনে যখন কেউ কষ্ট পায় তখন স্বাভাবিকভাবেই সে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ না করার চেষ্টা করে, সেটা থেকে ভয়াবহ রূপ নিতে যেন না পারে সেজন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে সেটাও বুঝতে হবে।’
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কথা বলাটা সমস্যা নির্ণয়ে সহায়ক, কথা বললেই সমাধান তা নয়। আমাদের উপমহাদেশে যে কোনও বয়সেই ‘মন খারাপ’ কথাটি বলা যায় না। কারণ ব্যাখ্যা করতে করতেই নানা হয়রানিতে পড়তে হয় বলে ডিপ্রেশনে থাকা ব্যক্তি সেটিকে লুকিয়ে রাভে। ফলে ট্রিটমেন্ট গ্যাপ তৈরি হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘হিডেন ডিপ্রেশন সমস্যাজনক। কথা বললেই সমাধান হবে তেমনটা একেবারেই না, বরং ডিপ্রেশন জিনিসটা যে উপস্থিত এবং সেটি নিয়ে যে আলাপ জরুরি সেটা মনে রাখতেই এ প্রতিপাদ্য।’
/এসটি/