বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে দেশের তৈরি পোশাক খাত শীর্ষে অবস্থান করায় এই খাতের গুরুত্ব সরকারের কাছে সবসময় বেশি। তবে এ খাতে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে নজর হারাচ্ছে দেশের অন্য সম্ভাবনাময় খাতগুলো। যদিও রফতানি আয় ক্রমবর্ধমান হারে বাড়লেও দেশে পণ্য বহুমুখীকরণের গতি খুবই ধীর। ফলে ঘুরে ফিরে কয়েকটি পণ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে রফতানি বাণিজ্য। এমনকি পাওয়া যাচ্ছে না ভিন্ন কোনও বাজার।
বিশ্লেষকদের মন্তব্য,শুধু তৈরি পোশাক খাতকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ফলে নগদ সহায়তার অর্থও পাচ্ছেন তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা। এ প্রণোদনা যৌক্তিক, তবে এর বাইরেও দেশের অনেক পণ্য বিদেশে রফতানির সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে চাহিদাও রয়েছে এসব পণ্যের। কিন্তু সরকার এদিকটাতে তেমন একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘দেশের রফতানি বৃদ্ধিতে পণ্যের বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য ২০১৫-১৮ সাল পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদি রফতানি নীতিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে ১২টি খাত। এগুলোর পণ্য রফতানিতে নির্দিষ্ট হারে সরকার প্রণোদনাও দিচ্ছে। কাজেই সরকার শুধু তৈরি পোশাক খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে এমন অভিযোগ সঠিক নয়। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা আছে বলেই রফতানি পরিমাণ বাড়ছে।’
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বিশ্ববাজারে চাহিদা ব্যাপক এমন অনেক পণ্য রয়েছে বাংলাদেশের। এসব পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ব্যাপক সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়ে আসছে সরকার। এমনকি নগদ সহায়তা পেতে ব্যবসায়ীরা যেন হয়রানির শিকার না হন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে সে বিষয়টিও সুরাহা করা হয়েছে। এজন্যই দেশে দিন দিন রফতানি বাণিজ্য বাড়ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তৈরি পোশাকের বাইরেও দেশের রফতানি বৃদ্ধিতে আরও কিছু পণ্যের রফতানিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—অধিক মূল্য সংযোজিত তৈরি পোশাক ও গার্মেন্ট এক্সেসরিজ, সফটওয়্যার ও আইটি এনাবল সার্ভিসেস এবং আইটি পণ্য, ওষুধ, জাহাজ, চামড়াজাত পণ্য ও জুতা, পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য, কৃষিপণ্য ও অ্যাগ্রো প্রসেসড পণ্য, আসবাবপত্র, হোম-টেক্সটাইল ও টেরিটাওয়েল এবং লাগেজ।
এদিকে রফতানি বৃদ্ধিতে বিশেষ উন্নয়মূলক খাত হিসেবে চিহ্নিত ১৪টি পণ্য হলো—বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ইলেক্ট্রনিক পণ্য, সিরামিক পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য (অটো পার্টস ও বাইসাইকেলসহ), মূল্য সংযোজিত হিমায়িত মৎস্য, পাপড়, প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, অমসৃণ হীরা ও জুয়েলারি, পেপার ও পেপার প্রোডাক্টস, রাবার, রেশম সামগ্রী, হস্ত ও কারুপণ্য, লুঙ্গিসহ তাঁত শিল্পজাত পণ্য ও নারকেলের ছোবড়া।
এর মধ্যে সিরামিক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, আসবাবপত্র, গরু-মহিষের হাড়, নারকেলের ছোবড়া, আইটি পণ্য, কুইচ্চা মাছ, শাকসবজি, হালাল মাংস উল্লেখযোগ্য। এসব পণ্য রফতানিতে সরকারের কাছ থেকে নগদ সহায়তা পাওয়া গেলে রফতানি বাণিজ্য আরও সমৃদ্ধ হতো বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
এ প্রসঙ্গে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মাফরুহা সুলতানা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, রফতানি নীতিতে চাকরিসহ ৩০টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি পণ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং ১৪টি পণ্যকে উন্নয়নমূলক খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এবারই প্রথমবারের মতো চাকরি (সার্ভিস) যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ট্যুরিজম, ইঞ্জিনিয়ারিং ও আইসিটি।
ইপিবি ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও উন্নয়নমূলক খাত নির্ধারণে বিশাল জনগোষ্ঠী ও বেকারত্ব বিবেচ্য বিষয়। কোন পণ্য কতটুকু বেকারত্ব দূর করবে, পণ্যটির ভ্যালু চেইনের কত অংশ দেশের ভেতরে আছে তা-ও বিবেচ্য বিষয়। যে পণ্যের ভ্যালু চেইনের বড় অংশই দেশের ভেতরে অবস্থান করে তাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আবার এটাও বিবেচনা করা হয় যে, পণ্যটির মূল্য কেমন কিংবা বিশ্ববাজারে এটি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে কিনা। পণ্য উৎপাদনে প্রাথমিক উপকরণের পর্যাপ্ততাও বিবেচ্য। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ সুবিধা দেশের ভেতরে থাকতে হবে এটাই মুখ্য।’
ইপিবি এবং বিজিএমই’র গবেষণা সেলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশ রফতানি বাণিজ্যের ইতিবাচক কর্মযজ্ঞে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় (৩৩.৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ২ দশমিক ২১ শতাংশ বেশি আয় করেছে অর্থাৎ রফতানি আয় অর্জিত হয়েছে ৩৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বছর শেষে রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রফতানি আয়ের রেকর্ড। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর একটি বড় অংশ তৈরি পোশাক রফতানির ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাজার সম্প্রসারণে সরকারি পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে এটা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশি পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে নতুন বাজার হিসেবে তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, ব্রাজিল, মধ্যপ্রাচ্য, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, আর্জেন্টিনা, চিলি, উরুগুয়ে, পর্তুগাল, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্তত ২৫টি দেশকে নতুন বাজার হিসেবে বিবেচনা করেন রফতানিকারকরা।
এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ বলেছেন, ‘পোশাক খাত থেকে আসছে রফতানি আয়ের ৮০-৮৫ ভাগ। এমন পরিস্থিতিতে পণ্য বহুমুখীকরণ নিয়ে বহুদিন ধরেই কাজ করছি। সরকার ঘোষণা দিয়েছে, প্রচলিত পণ্যের বাইরে নতুন কোনও পণ্য রফতানি করা হলে, তাতে প্রণোদনা দেওয়া হবে। মন্থর গতি হলেও বলবো বহুমুখীকরণ হচ্ছে।’
/এসআই/জেএইচ/টিএন/