রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নিয়ে ২০০১ সালে আদেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করেই গত ১৬ বছর ধরে তারা হাজারীবাগেই আছে। নানা টাল-বাহানা করে ট্যানারি মালিকরা সেখানে ছিলেন। এমনকি তারা শ্রমিকদেরও ভুল বুঝিয়েছেন। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের আশ্বস্ত করেছেন, ট্যানারিগুলো এখানেই থাকবে, তাদের কোথাও যেতে হবে না। তবে শনিবারই সেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। আদালতের নির্দেশেই হাজারীবাগের সব ট্যানারি কারখার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করে পরিবেশ অধিদফতর।
রাজধানীর হাজারীবাগে ছোট-বড় সব মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক ট্যানারি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় কাজ করেন ৫০ লাখ শ্রমিক। আদালত বারবার নির্দেশ দেওয়ার পরও মালিকপক্ষের গাফিলতির কারেণই হঠাৎ করেই ট্যানারি শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন। তারা জানেন না আগামী মাসে তারা বেতন পাবেন কিনা। তবে, এখনও মালিকপক্ষ শ্রমিকদের ঢাল করছেন। তারা এখনও হাজারীবাগেই থাকার পরিকল্পনা করছে। তারা আন্দোলনের যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। আর এ কাজে তারা শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ক্রিসেন্ট ট্যানারির শ্রমিক মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘ঈদের আর দুই মাস বাকি। ট্যানারিগুলো বন্ধ করায় মালিক আমাদের পাওনা বেতন দেবেন না। এখন আমরা বউ-পোলাপান নিয়া কোথায় যাবো?’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক শ্রমিক বলেছেন, ‘মালিকরা এতদিন বলেছে কারখানা এখানেই থাকবে। কোথাও সরবে না। এখন কি হলো?’
অনেক শ্রমিক তাদের এ অবস্থার জন্য মালিক ও বিসিক দু’পক্ষকেই দোষারোপ করেছেন। তাদের প্রশ্ন, এত সময় পাওয়ার পরও কেন মালিকরা সচেতন হয়নি? তাদের গাফিলতির কারণে আজ হাজার হাজার শ্রমিকরা কর্মহীন। আর বিসিক যদি সাভারের কারখানাগুলো সময় থাকতে প্রস্তুত করতো তাহলেও তাদের এই সমস্যায় পড়তে হতো না।
হাজারীবাগের ১২১/৩ শেরেবাংলা রোডে অবস্থিত এমএস ট্যানারি কারখানা মালিকের ভাই পরিচয়ে শামীম নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘কী আর করবো, এবার আমাদের সাভারের হেমায়েতপুরে যেতে হবে। তবে কেমনে যাবো? সেখানে তো গ্যাস নাই। ইটিপিও (কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার) ঠিক নাই। সরকার এভাবে সব বন্ধ করে দেওয়ায় ক্রেতারাও বিপাকে পড়বেন।’
এতদিন কেন গেলেন না জানতে চাইলে তিনি এর সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘এমএস ট্যানারি কারখানার অর্ধেক যন্ত্রপাতি সাভারের হেমায়েতপুরের নতুন কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাকিগুলোও নেওয়ার কাজ চলছে।’ গ্যাস সংযোগ না থাকায় কারখানার উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
শামীম বলেন, ‘ইটিপি না থাকায় সভারের নদী ও পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। চারদিকে চামড়ার গন্ধ ছড়াচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিবেশবাদীরা হয়তো সেখানে গিয়েও আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলবেন। তখন আমরা যাবো কোথায়?’
শনিবার দিনভর হাজারীবাগের সব ট্যানারি কারখানার বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পরিবেশ অধিদফতর। ট্যানারি মালিক ও শ্রমিকরা এই কার্যক্রম দেখলেও কেউ আপত্তি জানাননি।
অভিযান চলাকালে পরিবেশ অধিদফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহেদ হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের তালিকায় হাজারীবাগে ট্যানারি কারখানা রয়েছে ২২৪টি। এসব কারখানার সবগুলোতে গ্যাস ও পানির সংযোগ নেই। যেগুলোতে আছে সেগুলোর গ্যাস-পানি সংযোগ কেটে দেওয়া হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ সংযোগ সবগুলোতেই রয়েছে।’
বিকালে অভিযান শেষে অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সারওয়ার ইমতিয়াজ হাশমী জানান, ১২৩টি টেলিফোন সংযোগ, ১৯৩টি পানির লাইন, ২২৪টি বিদ্যুৎ সংযোগ ও ৫৪টি তিতাসের গ্যাস লাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এ বিষয়ে রবিবার আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামী ১০ এপ্রিল (সোমবার) সংবাদ সম্মেলন করে কর্মসূচি দেওয়া হবে। তবে কী ধরনের কর্মসূচি দেবো সেটা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।’
হাইকোর্ট ৩০ মার্চ এক আদেশে ৬ এপ্রিলের মধ্যে হাজারীবাগের সব ট্যানারি কারখানার কার্যক্রম বন্ধ করার আদেশ দেন। পাশাপাশি এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনও দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে ৯ এপ্রিল শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
ঢাকা জেলার সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা গ্রামে ১৯৯ একর জমির ওপর চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। সেখানে ১৫৫টি ট্যানারি কারখানাকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
/এসটি/এসএনএইচ/