কঠোর আন্দোলনের ছক কষছে ট্যানারি মালিকরা

17837100_1268313883216947_876082936_o

হাইকোর্টের নির্দেশে হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে পরিবেশ অধিদফতর। এতে সরকারের ওপর বেজায় চটেছেন ট্যানারি মালিকেরা। দফায় দফায় মিটিং করছেন এবং কঠোর আন্দোলনের ছক কষছেন তারা। তারা জানিয়েছেন, এবারের আন্দোলন হবে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন। এজন্য তারা খুবই কঠোর কর্মসূচি দেবে। দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকবেন ট্যানারি মালিকরা।

শনিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়ে এক জরুরি বৈঠকেও বসেন মালিকেরা। বৈঠক শেষে ঘোষণা করেন, সোমবার তারা আরও একটি বৈঠকে বসবেন। বৈঠক শেষ করে সংবাদ সম্মেলন করে কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, উপস্থিত ট্যানারি সংশ্লিষ্ট সব সংগঠনের নেতাকর্মীরা কঠোর আন্দোলনের পক্ষে মত দিয়েছেন। যে আন্দোলনের নেতৃত্বে মালিকেরা থাকলেও শ্রমিকদেরকেই মাঠে সক্রিয় থাকতে হবে। শ্রমিকরাও এর পক্ষে মত দিয়েছেন।

শ্রমিক নেতা শাহজাহান মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন আমার খাবো কী? থাকবো কোথায়? আমার সন্তান জানতে চায়, বাবা আমাদের কি এখন ভিক্ষা করতে হবে? আমার স্ত্রী জানতে চাই আমরা পথে বসে গেলাম নাকি? আমরা তো এভাবে ছিলাম না। আমাদেরকে আজ সরকার পথে বসিয়ে দিয়েছে। তাই আমরা এই আন্দোলনের রাজপথে থাকবো।’

হাজারীবাগে গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে

ট্যানারি মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন পরিবেশ অধিদফতর তাদের কাজ করেছে। কিন্তু আমরা শত শত মালিক শ্রমিক রয়েছি, আমরা পরিবেশ অধিদফতরের কাজে বাধা দিতেও পারতাম। কিন্তু আমরা বাধা দেইনি। কারণ আমরা আদালতকে অবমাননা করিনি। তবে আমরা কঠোর আন্দোলনে যাচ্ছি।

কয়েকজন মালিক সূত্রে জানা গেছে, তারা প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেবেন, জাতীয় প্রেসক্লাবসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলায় মানববন্ধন ও ধর্মঘটের ডাক দেবেন। সাভারের চামড়া কারখানার কাজও বন্ধ রাখবেন। আবার শিল্প মন্ত্রণালয় ঘেরাও করার কর্মসূচিও আসতে পারে বলে মনে করে তারা।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, কারখানা বন্ধ রাখায় বন্ধ থাকা দিনগুলোতে ব্যবসায় যত যত ক্ষতি হবে সেই ক্ষতিপূরণ দাবি করবে সরকারের কাছে। ক্ষতিপূরণের মধ্যে থাকবে রফতানি থেকে আয়ের লভ্যাংশ, শ্রমিকের বেতন ও তৃণমূল পর্যায় থেকে কাঁচামাল না কিনতে পারায় যে ক্ষতি হবে তারও ক্ষতিপূরণ সরকারের কাছে দাবি করবে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও প্রতারণার অভিযোগ এনে মামলা করবেন।

17858526_10154546167370773_322631270_o

ফিনিস লেদার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন মাহিন এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিসিকের কারণেই আমরা এত সংকটে পড়েছি। কারণ সংসদীয় কমিটির সভায় ট্যানারি কারখানা সরাতে সাভার এখনও সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত নয় বলেছে বিসিক। আর আদালতকে তারা বলেছে সাভার প্রস্তুত। ফলে তারা আমাদের সঙ্গে একটা প্রতারণা ও মিথ্যাচার করেছে।

তবে বিসিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মালিকদের মধ্যে কেউ কেউ এই দাবিটি তুলেছেন। তবে এ বিষয়ে চুড়ান্ত কোনও সিন্ধান্ত হয়নি। সোমবার সংবাদ সম্মেলের মাধ্যমেই সব জানাবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘চামড়া শিল্প বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি শিল্প। এই শিল্পকে ধ্বংস করার জন্যই সরকার এই রকম কাজ করলো। দেশের চামড়া এখন সবই ভারতে চলে যাবে। ভারত লাভবান হবে। এভাবে অন্যায়ভাবে যদি কোনও শিল্পকে নষ্ট করে দেওয়া হয় তাহলে কেউ আর কোনও শিল্প কারখারা গড়ে তুলবে না। এই প্রথম দেখলাম দেশের সরকার কোনও একটি শিল্পকে ধ্বংস করলো।’

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের কোটি কোটি টাকার রফতানি বন্ধ হয়ে গেলো। দেশের এত বড় ক্ষতি সরকারই করলো। বিদ্যুৎ, গ্যাস পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করেছে। চামড়া শিল্পের জন্য আজকের দিনটি কালো দিন। সাভারের কারখানাতে কাজ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি না করে হাজারীবাগের কাজ বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছে।’

17837743_10210735165393593_590721655_o

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বারবার বলেছি বুড়িগঙ্গার পানি ৯৫ ভাগ নোংরা করে সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় বাসিন্দারা। আর আমরা করি মাত্র ৫ ভাগ। কিন্তু বর্তমানে সাভারের পরিস্থিতি তো আরও নোংরা।’

কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আগামীকাল সংবাদ সম্মেলন করে জানাবো।’

প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে ট্যানারি শিল্প হাজারীবাগ থেকে সরিয়ে নিতে আদেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ট্যানারি শিল্প অন্যত্র সরিয়ে নিতে ২০০৯ সালের ২৩ জুন হাইকোর্ট ফের নির্দেশ দেন। সরকার পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরে ওই সময়সীমা কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যেও স্থানান্তর না হওয়ায় পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে আদালত অবমাননার মামলা করেন মনজিল মোরশেদ।

ট্যানারি থেকে জব্দ করা গ্যাস, পানির মিটার

গত বছর ১৬ জুন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ১৫৪টি ট্যানারি কারখানাকে প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন। জরিমানার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে এবং শিল্প সচিবকে এ বিষয়ে তদারকি করতে নির্দেশ দেন আদালত। এরপর গত ১৮ জুলাই প্রতিটি ট্যানারি কারখানাকে দৈনিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা থেকে কমিয়ে ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দেন আপিল বিভাগ।

/এমএইচ/এসটি/