শিশু হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধার অভাব প্রকট

শিশুদের সেবা দিতে হবে যত্ন নিয়ে

দেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ ভাগ শিশু, কিন্তু হাসপাতালগুলোর ৪০ শতাংশ সিট শিশুদের জন্য বরাদ্দ কিংবা নির্ধারিত নয়। মোট রোগীর মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধের সংখ্যা বেশি হলেও এবং শিশুদের জন্য চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা বেশি দরকার হলেও এর অভাব প্রকট। জাতির ভবিষ্যৎ বিবেচনায় চিকিৎসাসহ অন্য খাতগুলোতেও শিশুরা অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা থাকলেও তা দেখা যায় না। এ কারণে দেশে শিশুদের চিকিৎসার অবস্থা মোটেও সন্তোষজনক নয়।

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা শোনা গেলো আড়াই বছরের মেয়ে নাওয়ারার  বাবা নাসিরুল ইসলামের মুখে। তিনি বললেন, ‘আমার মেয়ের চোখের সমস্যার জন্য জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে যাই। চিকিৎসক তাকে দেখে তিন দিনের ওষুধ দেন। তিন দিন পর যাই হাসপাতালের শিশু বিভাগে। গিয়ে দেখি দরজা-জানালা সব বন্ধ। প্রচণ্ড গরমেও ভেতরে ফ্যান না থাকায় অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশুরা। ২০-৩০ সেকেন্ডের মধ্যে রোগীরা বের হয়ে আসছে চিকিৎসকের রুম থেকে। মেয়েকে নিয়ে চিকিৎসকের রুমে গেলে তিনি কেবল লাইট দিয়ে কয়েক সেকেন্ড দেখলেন চোখ। দেখেই টেস্ট দিয়ে রিপোর্ট নিয়ে দেখা করতে বললেন। চোখের কী সমস্যা জানতে চাইতেই বললেন অস্ত্রোপচার করাতে হবে। কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেও জানতে পারলাম না আমার মেয়ের কী সমস্যা। এর মধ্যে অন্য রোগী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি।’

ভোগান্তির শিকার হওয়ার কথা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়ে নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘দুই দিন ঘুরে মনে হলো সরকারি হাসপাতাল যেন শুধুই হয়রানির নাম।’ কেবল তিনি একাই নন, শিশুদের নিয়ে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হওয়া অভিভাবকদের অনেকেরই অভিজ্ঞতা এমন করুণ। অভিভাবকরা বলছেন, বাংলাদেশে শিশু রোগীদের অনুপাতে চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই, নেই শিশুদেরকে বুঝে ও তাদের সঙ্গে মিশে চিকিৎসা দেওয়ার মানসিকতা। আর রাজধানী ঢাকায় কিছুটা সেবা পাওয়া গেলেও বিভাগীয়, জেলা শহর বা থানা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে শিশুদের চিকিৎসাসেবার অবস্থা বেহাল।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় বড় শহরের হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্য কিছুটা ব্যবস্থা থাকলেও জেলা ও উপজেলা বা থানা পর্যায়ে শিশুদের উপযোগী চিকিৎসাসেবা একেবারেই অপ্রতুল। সেখানে শিশুদের বিশেষায়িত হাসপাতালের ভাবনা আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া অন্যকিছু নয়। আবার রাজধানী ঢাকায়ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত একমাত্র শিশু হাসপাতালটি ছাড়া প্রায় সব বড় হাসপাতালেই আছে শিশুদের জন্য পৃথক বিভাগ। কিন্তু সেখানেও রোগীর তুলনায় আসন সংখ্যা সীমিত। সেবার মান আর ধরন নিয়েও রয়েছে অভিভাবকদের অভিযোগের পাহাড়।

জানা গেছে, প্রতি বছর দেশে প্রায় ১২ হাজারের বেশি শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। এসব শিশুদের চিকিৎসায় দেশের হাসপাতালগুলোতে শয্যার সংখ্যা মাত্র ৯০টি। আর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন ৩০ জনেরও কম।

অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) শিশু কার্ডিওলজি ইউনিট যাত্রা শুরু করে ২০০৪ সালে। কিন্তু ওই বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপক বলেন, ‘এখানে সঠিক যন্ত্রপাতি না থাকা এবং চিকিৎসকদের অদক্ষতায় শিশুদের রোগ সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় না। কারণ বড় ও ছোটদের হৃদরোগের মধ্যে পার্থক্য অনেক।’

বিএসএমএমইউয়ের ওই চিকিৎসক আরও জানান, শিশু কার্ডিয়াক সার্জারিতে অনেক পিছিয়ে আছে দেশ। রাজধানীতে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ছাড়া অন্য কোথাও শিশু হৃদরোগীদের সার্জারি হয় না। তাই গুরুতর ও জটিল শিশু রোগীদের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশকেই যেতে হয় দেশের বাইরে।

unnamed

নবজাতকদের চিকিৎসার ক্ষেত্র এখনও দেশে তৈরি হয়নি বলে মনে করেন জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নবজাতকদের ব্রেইন বা কিডনির কোনও রোগ হলে অভিভাবকদের ছুটতে হয় দেশের বাইরে। যাদের সেই সামর্থ্য নেই, তাদের দেশেই চেষ্টা করা ছাড়া বিকল্প থাকে না।’

কিন্তু দেশের হাসপাতালগুলোর এনআইসিইউগুলো (নিওন্যাটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) এখনও অসম্পূর্ণ বলে মনে করেন ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার। তিনি বলেন, ‘এই কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি নেই। আবার নবজাতক বিশেষজ্ঞদের সংখ্যা বাড়লেও তাদের আরও উন্নত প্রশিক্ষণ দরকার। শিশুদের কিডনি, হৃদযন্ত্র, ক্যানসার বা অন্য রোগগুলো সম্পর্কে ধারণা এখনও স্পষ্ট নয়। এজন্য বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন বা হার্টের সার্জারির মতো উল্লেখযোগ্য সেবাদানে আমরা পিছিয়ে আছি।’

চিকিৎসকরা দ্রুত উপশমের জন্য মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকেন বলেও মন্তব্য করেন ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার। তিনি বলেন, ‘এখন চিকিৎসকরা রোগীদের সময় দেন কম। কিন্তু যেহেতু শিশুরা কথা বলতে পারে না, তাই চিকিৎসকদের উচিত শিশুদের আরও বেশি সময় দেওয়া। এমনটা দেশে একেবারেই দেখা যায় না।’

অন্যদিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এবং ১০০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মুনীরুজ্জামান সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারাদেশে যত শিশু রোগী আছে, তার তুলনায় হাসপাতালের সিটের সংখ্যা অপ্রতুল। আরও অনেক বেশি কিংবা বিশেষায়িত সেবার মতো স্বাস্থ্যসেবা দরকার দেশে, বিশেষ করে শিশুদের জন্য। একইসঙ্গে শিশুদের সঙ্গে আচরণের জন্য যে স্ট্যার্ন্ডাড সেটআপ দরকার, সেটাও প্রতিষ্ঠিত হয়নি দেশে।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলা শহর বা তারপরের পর্যায়ের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে শিশুদের বিশেষায়িত সেবার ব্যবস্থা নেই। বড় শহর ছাড়া এনআইসিইউ সুবিধাও নেই কোথাও। শিশুদের পৃথকভাবে চিকিৎসা করার যে সামাজিক ও মেডিক্যাল পরিবেশ দরকার তা-ও আমাদের মনোজগতে নেই।’

শিশুদের অবজ্ঞা ও অবহেলার চোখে দেখার ক্ষেত্রে চিকিৎসকরাও ব্যতিক্রম নন উল্লেখ করে ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘একজন শিশু বিশেষজ্ঞকে হতে হবে শিশুবান্ধব। তার আচরণ, পোশাক, কথা এবং চেম্বারেও এর প্রতিফলন থাকতে হবে। শিশু চিকিৎসা সমাজ মনস্তত্ত্বের অংশ। সেখানে বিষয়গুলো স্থান পেলে শিশুদের চিকিৎসায়ও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।’

/জেএ/টিআর/জেএইচ/