ঘটনাবহুল চার দিনের ভারত সফর শেষে আজ সোমবার স্থানীয় সময় বিকেল পৌনে ৫টায় দিল্লি ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।এসময় বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানান ভারতের ভারী শিল্প প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। যে সন্তুষ্টি নিয়ে ২০১০ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি দিল্লি ছেড়েছিলেন, এবারে তার কিছুটা ব্যতিক্রমী চিত্র ফুটে উঠেছে। সোমবার সকালে ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বৃক্ততায় অনেকটা তীর্যকভাবে বলেছেন, ‘চাইলাম পানি, পেলাম বিদ্যুৎ। ভালোই হয়েছে, কিছুতো পেয়েছি।’
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন,‘দিদিমনি কি করবেন আমি জানি না। ওনার সঙ্গে কথা হয়েছে। উনিতো নতুন কিছু দেখালেন। (নরেন্দ্র) মোদি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। এখন আমরা অপেক্ষা করছি।’
দিল্লি ছাড়ার আগে শেখ হাসিনার মন্তব্যে বোঝা গেল, তিনি খুশি মন নিয়ে ভারত ছাড়েননি।
এবারের সফরে প্রধানমন্ত্রী ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি,পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনসহ সব জায়গায় বাংলাদেশের পানি সমস্যার বিষয়টি তুলে ধরলেও, ভারত সরকারের পক্ষে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মৌখিক আশ্বাস ছাড়া কিছু মেলেনি।বাংলাদেশের অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও দুদেশের লিখিত যৌথ বিবৃতিতে তিস্তাচুক্তির সময়সীমা নির্দিষ্ট করার বিষয়ে কোনও প্যারাসংযুক্তি করতে ভারত রাজি হয়নি।
কি পেলাম, কি দিলাম
শেখ হাসিনার এবারের সফরে বাংলাদেশের প্রধান দাবি তিস্তা চুক্তির কোনও সুরাহা হয়নি। বাংলাদেশ ও ভারত ছয় বছর আগে তিস্তাচুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করলেও আজও তা বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। শনিবার দুই প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠকের পরে নরেন্দ্র মোদি মৌখিক বক্তব্যে তার সরকার ও হাসিনার সরকারের বর্তমান মেয়াদকালে এ চুক্তি হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে যৌথ কারিগরী টিমের কাজ শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ। এপ্রস্তাবেও নির্দিষ্ট কোনও সময় বেঁধে কাজ না করার পক্ষপাতি ভারত।সব মিলিয়ে পানি বিষয়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য নয়।
ভারত গত নভেম্বর মাসে দুদেশের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করার প্রস্তাব দেয় এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ একটি সমঝোতা স্মারক করার বিষয়ে একমত হয়। মাত্র চার মাসের দর কষাকষির পর বাণিজ্যিক উপাদান সংযুক্ত একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামোতে সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়।বর্তমান সফরে সেটা সই হয়েছে। এছাড়া সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার লাইন অফ ক্রেডিট দিয়েছে ভারত। এ সমঝোতা স্মারকে ভারত থেকে অস্ত্র কেনার বাধ্যবাধকতার বিষয়টি না থাকলেও, অন্য দেশ থেকে অস্ত্র ক্রয় করার জন্য ভারত এ অর্থছাড় করবে কিনা, সেটি দেখার বিষয়।
ভবিষ্যৎ সম্পর্ক
১৯৯৬ সালে ৩০ বছরের গঙ্গাচুক্তি করার সময়ে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বাংলাদেশকে সর্বত্রভাবে সহায়তা করেছিলেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কাকাবাবুর (জ্যোতি বসু)সুসম্পর্ক ছিল। সেসময় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশকে পশ্চিমবঙ্গের লেন্স দিয়ে দেখতো এবং বাংলাদেশও অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের সহায়তা নিয়ে থাকতো।
২১ বছর পরে এসে বর্তমানের চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। এখন দিল্লি সরাসরি ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করে। শেখ হাসিনা পশ্চিমবঙ্গের নেতা মমতা ব্যানার্জির তুলনায়, গুজরাট থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া নরেন্দ্র মোদির ওপরে বেশি ভরসা করেন।শেখ হাসিনা তার কথাবার্তায় পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি মমতাকে বিশ্বাস করেন না।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই শেখ হাসিনার সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছিলেন। কারণ তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতকে পাশে না পেলে বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যহত হতে পারে। তিনি প্রথম থেকে চেষ্টা করেছিলেন দুদেশের সম্পর্ক ন্যায্যতা, সমতা এবং বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে হবে এবং এচেষ্টা অব্যাহত আছে।
আশাহত ঢাকা দিল্লির হাত ছাড়বে না। তবে অন্যান্য বৃহৎ শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও বেশি ঘনিষ্ঠ হলে হওয়ার কিছু থাকবে না।
/এপিএইচ/
আরও পড়ুন-
বাংলাদেশ তিস্তার জন্য অপেক্ষা করছে: শেখ হাসিনা
মমতার প্রস্তাবে বিব্রত শেখ হাসিনা, অস্বস্তিতে মোদি সরকার
তোর্সার পানি বণ্টনের প্রস্তাবকে গ্রহণযোগ্য মনে করে না দিল্লি!