স্থলসীমান্ত চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ

 

বাংলাদেশ- ভারতভারতের সঙ্গে ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থলসীমান্ত চুক্তির বিষয়টি উত্থাপন করে এর পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানান। বৈঠকের পর নরেন্দ্র মোদি তার বক্তব্যে বলেন, ‘স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলছে।’ এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি অনেকদিন থেকে ঝুলে আছে। বাংলাদেশ এর আশু সমাধান চায়। দুই প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।’

স্থলসীমান্ত চুক্তির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ছিটমহল বিনিময়, অপদখলীয় জমির সুরাহা এবং ৬.৫ কিলোমিটার অমীমাংসিত সীমান্তের সীমানা নির্ধারণ। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মাঠ থেকে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার পর ২০১১ সালে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রটোকল স্বাক্ষর করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে ভারতের উভয় সংসদে স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুমোদনের পর ছিটমহল বিনিময় হয়, অপদখলীয় জমির মীমাংসা হয় কিন্তু ৬.৫ কিলোমিটার অমীমাংসিত সীমান্তের মধ্যে ২ কিলোমিটার সীমানা ভারতের আপত্তির কারণে নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে স্থল সীমান্ত চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করা জটিল হয়ে পড়ছে।

এই প্রসঙ্গে সরকারের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ‘ভারত ১০ একর জায়গা বেশি চাইছে কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে দুই দেশের সার্ভেয়াররা মিলে হিসাব করে সীমান্ত নির্ধারিত হয়েছে। ২০১২ সালে ভারত সেটি মেনে নিয়ে ইনডেক্স ম্যাপ স্বাক্ষর করে। এখন এটি পরিবর্তনের সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন,  ‘মুহুরীর চর সীমানা নির্ধারণের জন্য ১৯৭৭-৭৮ সালে একটি জরিপ হয়।  ২০১১ সালে এ চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭-৭৮ সালের জরিপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করা হয়। ভারত সেটি মেনে নিয়ে ইনডেক্স ম্যাপ স্বাক্ষর করে। ভারতের সংসদের উভয় কক্ষ সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ২০১৫ সালে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করে।’

উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সফর করে এ চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সীমা নির্দিষ্ট করে একটি ইনস্ট্রুমেন্ট স্বাক্ষর করেন। এর একমাস পরে যৌথ সীমান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে ভারত বিষয়টির অবতারণা করে। ওই সময় বলে মুহুরীর চরের জন্য যে ইনডেক্স ম্যাপ স্বাক্ষর করা হয়েছিল, সেটি ভুল করে স্বাক্ষর করা হয়েছিল। এটিকে নতুন করে বিবেচনা করে পুনঃস্বাক্ষরের প্রস্তাব দেয় তারা।

বাংলাদেশ পক্ষ থেকে বলা হয় গোটা প্রক্রিয়াটি ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থলসীমান্ত চুক্তি ও ২০১১ সালে স্বাক্ষরিত এর প্রটোকল অনুযায়ী করা হয়েছে। এর পরিবর্তনের কোনও সুযোগ নেই।

এই প্রসঙ্গে সরকারের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘একপর্যায়ে বিষয়টির কোনও মীমাংসা না হওয়ায় রাজনৈতিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে এটি মীমাংসার জন্য রেখে দেওয়া হয়।’  তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সীমান্ত আছে ৪১৫৬ কিলোমিটার, যা ১ হাজার ১৪৫টি স্ট্রিপ ম্যাপ দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে। উভয় দেশ ১ হাজার ১৪৪টি স্ট্রিপম্যাপ স্বাক্ষর করলেও একটি স্ট্রিপম্যাপ স্বাক্ষর করতে রাজি হচ্ছে না ভারত।’

উভয় দেশের তিনটি জায়গায় অমীমাংসিত সীমান্ত রয়েছে উল্লেখ করেন সরকারের ওই কর্মকর্তা বলেন,  ‘এরমধ্যে ফেনীর মুহুরীর চরে আছে ২ কিলোমিটার, সিলেটের লাঠিটিলায় ৩ কিলোমিটার ও পঞ্চগড়ের দইখাতায় ১.৫ কিলোমিটার সীমান্ত। মাঠ পর্যায়ে তিনটি সীমান্ত জরিপের পরে লাঠিটিলা ও দইখাতার সীমান্ত মেনে নিলেও ফেনীর সীমান্ত মানতে রাজি নয় ভারত।’ তিনি আরও বলেন, ‘উভয় দেশ মাপজোক ও রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করে মুহুরীর চরের সীমান্ত নির্ধারণ করে এবং ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ইনডেক্স ম্যাপ স্বাক্ষর করে। উভয় দেশের যৌথ ত্বত্ত্বাবধানে ২০১৪ সালে ৪৫টি সীমান্ত খুঁটিও স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে শুধু মাপ দিয়ে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়নি, এখানে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়গুলো কেউ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

উদাহরণ হিসাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘মুহুরীর চরেই একটি শ্মশান আছে যেটি বাংলাদেশের সীমানায় পড়েছে কিন্তু সেখানে ভারতীয়রা মৃতদেহ সৎকার করে। আলোচনা পর্যায়ে ভারত এ শ্মশানটি তাদের অঞ্চল হিসাবে চাইলে ধর্মীয় স্পশকাতরতা বিবেচনা করে বাংলাদেশ রাজি হয়।

আরও পড়ুন: চাইলাম পানি, পেলাম বিদ্যুৎ: দিল্লি ছাড়ার আগে শেখ হাসিনা

/এমএনএইচ/