পুরনো ঢাকার বাহাদুরশাহ পার্কের সামনে থেকে বুধবার সকাল আটটায় মিরপুরের দুয়ারিপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় ‘সিটিং সার্ভিস’নামে পরিচিত বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা মেট্রো ব-১১-৮৭১২)। কোনও আসন খালি নেই, সব আসনেই যাত্রী বসা।
সিটিং সার্ভিস হওয়ায় বাসটির দরজা বন্ধ করে চলার কথা। কিন্তু পথিমধ্যে থামিয়ে থামিয়ে লোকাল বাসের মতো যাত্রী তোলা হলো। এভাবে প্রায় এক কিলোমিটার পথ এগোতেই বাসের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের ঠাসাঠাসি অবস্থা।
যাত্রীদের ভাড়া আদায়ে বিহঙ্গ পরিবহনের কোনও টিকিট নেই।বাসের ভেতরে বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার চার্টও নেই। কনডাক্টর ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করতে থাকেন। বাহাদুরশাহ পার্ক থেকে গোলাপশাহ মাজারের দূরত্ব দুই কিলোমিটারের সামান্য বেশি। বিআরটিএ- এর হিসাবে (মিনিবাসে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ১ টাকা ৬০ পয়সা) এ দূরত্বে ভাড়া আসে ৫ টাকা। কিন্তু কনডাক্টর আদায় করেন জনপ্রতি ১০ টাকা।
বাহাদুরশাহ পার্ক থেকে ফার্মগেটের দূরত্ব ৭.৯ কিলোমিটার, সেই হিসাবে ভাড়া হওয়ার কথা ১৩ টাকা। কিন্তু বাহাদুরশাহ পার্ক থেকে ওঠা যাত্রীরা গুলিস্তানের পর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত যেখানেই নামলেন, দিতে হলো ২০ টাকা করে এবং ফার্মগেইট ও দুয়ারিপাড়ার মাঝখানের যেকোনও স্টপেজে নামা যাত্রীদের দিতে হলো ৩০ টাকা করে। অথচ বিআরটিএ’র হিসাবে বাহাদুরশাহ পার্ক থেকে কাজীপাড়ার ভাড়া ২১ টাকা, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচক্কর পর্যন্ত ভাড়া ২৩ টাকা।
সিটিং সার্ভিসের নামে এভাবে ঠাসাঠাসি করে যাত্রী পরিবহন এবং ইচ্ছা মতো ভাড়া আদায় নিয়ে বিহঙ্গ পরিবহনের ভেতরে রীতিমত গোলযোগ লেগে যায়। যাত্রীরা আপত্তি জানিয়েও সুবিধা করতে পারেন না। বাধ্য হয়ে তারা অতিরিক্ত ভাড়া পরিশোধ করেন। বাসের যাত্রী ফার্মগেট মার্কেটের ব্যবসায়ী আক্তার হোসেন বলেন, ‘সিটিং সার্ভিসের নামে প্রতারণা চলছে। মালিকদের কাছে আমরা জিম্মি হয়ে আছি।’
বাসের চালক মো. পান্না বলেন, ‘দিনে ট্রিপ মারতে পারি চার থেকে পাঁচটা। বাস চালিয়ে প্রতিদিন আমাদের কমপক্ষে আট হাজার টাকা কালেকশন করতে হয়। নাহলে মালিকরা অসন্তুষ্ট হন। এ কারণে কিছুটা অতিরিক্ত যাত্রী তুলতে হয়। আর ভাড়া মালিকরাই নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
সিটিং সার্ভিস নামে যাত্রীদের সঙ্গে এমন প্রতারণা কেবল বিহঙ্গ পরিবহনই নয়,রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ কোম্পানির বাসই যাত্রীদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে প্রতিনিয়ত জোর জবরদস্তি করে।এসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে অনাবিল, সালসাবিল, জাবালে নূর, সুপ্রভাত, প্রজাপতি, ভিক্টর, তুরাগ, মিরপুর পরিবহন প্রভৃতি। এসব বাসে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হয়। ভাড়ার চার্ট নেই। দুই-একটা কোম্পানি ছাড়া কোনও বাসে যাত্রীদের টিকিট দেওয়া হয় না। টিকিট চাইলে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন হেলপার-কনডাক্টররা। দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ পারেনি এই অরাজকতা ঠেকাতে।
পরিবহন মালিকদের সংগঠন ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাসের গায়ে ‘সিটিং সার্ভিস’লেখা থাকলেও অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করা হয়। টিকিট দেওয়া হয় না। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার সময় পুরো পথের ভাড়া নেওয়ার পাশাপাশি রাস্তা থেকে যাত্রী তোলা হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সংগঠনের সভা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস থাকবে না। বাস চলবে আইন অনুসরণ করে।’
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বুধবার বিআরটিএ পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিদর্শনকালে বলেন, ‘শুধু বাড়তি ভাড়া আদায়ের জন্য সিটিং সার্ভিস করা হয়েছে। এবার মালিকরাই সেটা বন্ধ করেছে। এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।’
বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান মো. মশিয়ার রহমান বলেন, ‘গাড়ির কাগজপত্র ঠিক থাকার পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছে।’
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী বিআরটিএ’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোসাম্মৎ জোহরা খাতুন বলেন, ‘ইদানিং চালকদের বেপরোয়া মনোভাব কিছুটা কমেছে। কারণ আগে শুধু আর্থিক জরিমানা করা হতো। অর্থের পরিমাণ কম থাকায় জরিমানা দিয়ে সবাই পার পেয়ে যেতো।বর্তমানে জরিমানা ও কারাদণ্ড উভয় শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, প্রায় পাঁচ হাজার বাস ও মিনিবাস নগরীর প্রায় দু’শ রুটে চলাচল করছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে সরকার গণপরিবহনে যাত্রী ভাড়া পুনর্নিধারণ করে। সে অনুযায়ী বায়ান্ন আসনের বড় বাসে প্রতি কিলোমিটারে যাত্রী ভাড়া ১ টাকা ৭০ পয়সা এবং ত্রিশ আসনের মিনিবাসে ১ টাকা ৬০ পয়সা। বড় বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৭ টাকা এবং মিনিবাসে ৫ টাকা। ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) প্রতিটি স্টপেজের জন্য ভাড়া নির্ধারণ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। মোটরযান আইনে ‘সিটিং সার্ভিস’ বলতে কোনও শব্দ নেই। বিআরটিএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি বাসে যাত্রী ভাড়ার চার্ট টাঙ্গিয়ে রাখার কথা।
/ওএফ/ এপিএইচ/