‘আনন্দলোকে মঙ্গল আলোকে বিরাজ সত্যসুন্দর’- এই প্রতিপাদ্য নিয়ে বাংলা ১৪২৪ সাল বরণ করে নিতে প্রথমবারের মতো নানা আয়োজন করেছে রাজধানীর সরকারি বেসরকারি স্কুল কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ অঙ্গীকারের ঘোষণা দিয়েই দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানমালা সাজানো হয়। অন্য বছরগুলোতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগে বর্ষবরণ করলেও এবার বর্ষবরণে উচ্ছ্বাস ছিল ভিন্ন মাত্রায়।
উৎসবে মেতে ওঠা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টরা মঙ্গল শোভাযাত্রা উৎসবের জন্য সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা ও বাড়তি অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন। তারা জানান, অন্য বছর আয়োজন থাকলেও প্রাণ ছিল না। বিভিন্ন অনুষ্ঠান থাকলেও র্যালি হতো না। এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার র্যালি ভিন্ন মাত্রা এনেছে বৈশাখী অনুষ্ঠানে। যদিও মঙ্গল শোভাযাত্রা করার মতো পর্যপ্ত উপকরণ ছিল না অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের।
শুক্রবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৯টার দিক থেকে রাজধানীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মঙ্গল শোভাযাত্রা দিয়ে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শুরু হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্কুল ড্রেস করে আবার অনেকে রঙিন পোশাক পরে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে অংশ নেন। মঙ্গল শোভাযাত্রার র্যালির পর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একে একে চলতে থাকে নাচ-গান, বাউল সঙ্গীত, লোক সঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীতের আয়োজন। বেসরকারি স্কুল কলেজের চেয়ে সরকারি স্কুল কলেজ অপেক্ষাকৃত বেশি উৎসব মুখর ছিল। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃহস্পতিবার রাত থেকেই আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করে নিজ উদ্যোগে।
বেসরকারি স্কুল ও কলেজগুলোর মধ্যে নিরাপত্তার কারণে এবং সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় খানিকটা দ্বিধা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মঙ্গল শোভাযাত্রার র্যালি দিয়ে শুরু করে বর্ষবরণ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও তাদের সাংস্কৃতিক ক্লাবগুলো রাত থেকেই বিভিন্ন আয়োজন করে। রাতে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের রাস্তায় তারা ‘আলপনায় বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। এরপর সকাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা দিয়ে শুরু করে বর্ষবরণের কর্মসূচি। এবার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় নাচগানসহ বিস্তারিত কর্মসূচির পাশপাশি আয়োজনে রেখেছে পুতুলনাচ। ইউল্যাব চৈত্র সংক্রান্তির দিনেই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। ধানমণ্ডির ক্যাম্পাসে বৈশাখী মেলার আয়োজনও করে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি।
রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণ আলপনা দিয়ে সাজানো হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রার র্যালিতে ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহার করা হয়েছে। রঙিন পোশাকে অংশ নিয়েছে শিক্ষার্থীরা। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্কুলড্রেস পরেও মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ অন্যান্য অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।
১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে রাজধানীর শাহবাগে প্রথমবারের মতো বের করা হয়েছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। প্রথম শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, ঘোড়া, হাতি। পরের বছরে চারুকলার সামনে থেকে নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতিসহ আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়। এরপর থেকে বাংলার ঐতিহ্যের উপকরণ বাংলা বর্ষবরণের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এই আনন্দ শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে চলতে থাকে প্রতি বছর। সব শেষে গত বছরের (২০১৬) ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রাকে ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ এর স্বীকৃতি দেয়। এরপর গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সব স্কুল ও কলেজে আড়ম্বরপূর্ণ বর্ষবরণ আয়োজনের নির্দেশনা জারি করে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর গত ১৬ মার্চ সংশ্লিষ্ট অধঃস্তন দফতরগুলোর জন্য বর্ষবরণে নির্দেশনা জারি করে। ওই নির্দেশনায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের আওতাধীন সব প্রতিষ্ঠান প্রধানকে নিজম্ব ব্যবস্থাপনায় উৎসবমুখর পরিবেশে ও যথাযথ আড়ম্বরে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে বলা হয়।
মহানগর ও জেলা সদরে কেন্দ্রীয় মঙ্গল শোভাযাত্রা
রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের প্রধান, শিক্ষক কর্মচারী, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্টরা দাবি জানান, সারা দেশের জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন সদরে কেন্দ্রীয়ভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ বৈশাখের আয়োজন করতে হবে। এতে থাকবে সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা। কোনও জেলা বা উপজেলায় একাধিক বড় অনুষ্ঠানও হতে পারে। নিরাপত্তার ব্যবস্থা রেখে কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানে সরকারি বরাদ্দেরও দাবি জানান তারা।
রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম, ভিকানরুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক ফোরামের সভাপতি জিয়াউল হক কবির, সেগুন বাগিচা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক একেএম ওবায়দুল্লাহ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অভিভাবক কমিটির নেতা মো. শহীদুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মল্লিকা রয় মমসহ সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রথমবারের মতো যে আয়োজন হয়েছে তা অনেক সুন্দর। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ঘোষণা করা উচিত। ’
অর্থ বরাদ্দ বাড়িয়ে বিস্তারিত কর্মসূচি পালনের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদার করারও প্রয়োজন আছে বলে জানান তারা।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অঙ্গনেই থাকবে নাকি রমনা এলাকায় র্যালিতে নিয়ে যাওয়া হবে, তার একটা নির্দেশনা প্রয়োজন। নিরাপত্তা থাকতে হবে র্যালির জন্য। ব্যাপকভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রা করার ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।’
মোহাম্মদপুরের সরকারি গ্রাফিকস আর্টস কলেজের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক কমিটির প্রধান মো. আয়েত আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাত্র ১৩ হাজার টাকায় দিনদিন ব্যাপী পুরো অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। মঙ্গল শোভাযাত্রাতেই এর চেয়ে বেশি টাকা প্রয়োজন। তারপরেও আমরা বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। নববর্ষের আগের দিন থেকে তিন দিন আলোকসজ্জার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অভিভাবক কমিটির নেতা মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের এদিন স্কুলড্রেস না পরিয়ে রঙিন পোশাকে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে রাজধানীর একাধিক জায়গায় বড় অনুষ্ঠান করতে সরকারের চিন্তাভাবনা করা উচিত। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন দুটি কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান করলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেই অনুষ্ঠানেও অংশ নিতে পারবে।
/এসএমএ/টিএন/