মালিকদের ইন্ধনে কর্মসূচির ফাঁদে ট্যানারি শ্রমিকরা

ট্যানারি মালিক ও শ্রমিক সমিতির সমাবেশ

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি কারখানা সাভারে স্থানান্তরের জন্য আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন হওয়ায় রাজপথে নেমে আন্দোলন করছেন ট্যানারি কারখানার মালিক-শ্রমিকরা। শোনা যাচ্ছে, মালিকরাই সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামিয়েছে শ্রমিকদের। মালিকদের ইন্ধনেই ট্যানারি স্থানান্তরের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়ার ফাঁদে পড়ছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

শ্রমিক-মালিকের ৯ দফা দাবিতে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গত ১২ এপ্রিল সকালে রাজধানীর হাজারীবাগে হাজার হাজার শ্রমিক ও কয়েকজন মালিক কালো পতাকা মিছিল বের করেন। মিছিলে নারী শ্রমিকদেরও দেখা যায়। যদিও বেশিরভাগ মালিকই অংশ নেননি এ কর্মসূচিতে।
শ্রমিকরা সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমাদের ৯ দফা দাবি মানতেই হবে। সাভারের কারখানায় শ্রমিকদের বাসস্থান, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে। ১৫ দিনের মধ্যে সাভার কারখানায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দিতে হবে। বেতনভাতাসহ সব ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’

এ সময় মিছিল নিয়ে হাজার হাজার শ্রমিক জিগাতলা ঘুরে আবার ট্যানারি মোড়ে জড়ো হয়। মিছিলে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ ফিনিশ লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ। শ্রমিকদের বেতনভাতা দেবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের দ্বিতীয় রফতানি আয় অর্জনকারী চামড়া শিল্প ধ্বংসের পেছনে আমরা দায়ী নই, দায়ী সরকার। আমরা তো সাভারে যেতেই চেয়েছি। কিন্তু ষড়যন্ত্র করেছে বিসিক ও কিছু পরিবেশবাদী সংগঠন। উৎপাদন বন্ধ থাকলে রফতানিও বন্ধ থাকবে, তাই আয়ও বন্ধ থাকবে। তাহলে শ্রমিকদের বেতন কীভাবে দেবো? সরকারকেই এ দায় নিতে হবে।’

ট্যানারি মালিক ও শ্রমিকদের কালো পতাকা মিছিল

বেতনভাতাসহ ক্ষতিপূরণের দায় থেকে মুক্ত হতেই ট্যানারি কারখানার মালিকরা কৌশল অবলম্বনে করছেন বলে অভিযোগ কয়েকজন শ্রমিক নেতার। তারা বলেন, 'আমরা তো মালিকের বিরুদ্ধে যেতে পারি না। কারণ আমরা তাদের কারখানায় চাকরি করি। কিন্তু আমরা জানি এ বিষয়ে মালিকরাই ভুল করেছেন। কারণ সরকার ট্যানারি কারখানা যতবারই সরাতে চেয়েছে মালিকরা ততবারই বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তারা একরকম জোর করেই হাজারীবাগে থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু তাদের বোঝা উচিত ছিল, সরকার চাইলে হাজারীবাগে ট্যানারি থাকতে পারবে না। মালিকরা কেন এটাকে গুরুত্ব দেয়নি? তাহলে এ দায় কার? মালিকদের কারণেই আজ খেটে খাওয়া মানুষগুলো ভুক্তভোগী।'

ট্যানারি শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেকও নিজেদের ভুক্তভোগী দাবি করে বাংলা ট্রিবিউনকে বললেন, ‘এর দায় সরকার ও মালিক উভয় পক্ষের।’ এর বেশি কিছু বললে সমস্যা আছে বলেও জানান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমরা কর্মচারি, মালিকের চাকরি করি। আমরা তো সরকারি চাকরি করি না যে, সরকার বেতনভাতা দেবে। আমাদের বেতনভাতা মালিকদেরই দিতে হবে। তাছাড়া মালিকদের জরিমানার টাকাও সরকার মওকুফ করে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আজ বাধ্য হয়ে রাস্তায় কালো পতাকা নিয়ে নেমেছি। কারণ মালিকরাই আমাদের রাস্তায় নামতে বলেছেন। তারা বলেছেন, রাস্তায় না নামলে দাবি আদায় হবে না।’

এদিকে হাজার হাজার শ্রমিক মিছিলে উপস্থিত থাকলেও মালিকদের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদও ছিলেন না। তাকে ফোন করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি অসুস্থ ছিলাম তাই মিছিলে যেতে পারিনি।’ শ্রমিকদের বেতনভাতা দেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুরো চামড়া শিল্পই স্তব্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদন নেই। তাহলে আমরা শ্রমিকদের বেতন কীভাবে দেবো?’

অবশ্য শ্রমিকদের এক-দুই মাসের বেতন দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘সরকার যদি সাভার প্রস্তুত করতে করতে এক বছর সময় নেয় তাহলে আমরা তো এক বছর শ্রমিকদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিতে পারবো না। হয়ত এক-দুই মাসের বেতন দিতে পারি। এছাড়া ব্যাংকও আমাদের এখন ঋণ দেবে না। তাহলে আমরা কোথায় যাবো?’

প্রসঙ্গত, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরানোর জন্য হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন করতে পরিবেশ অধিদফতর কারখানাগুলোতে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। এরপর থেকে সেগুলো বন্ধ রয়েছে।

/আরএআর/এসএনএইচ/জেএইচ/