চুক্তি ঠেকাতে তিস্তা নিয়ে মমতার নতুন প্রতিবেদন


মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়তিস্তা চুক্তি ঠেকানোর জন্য মরিয়া হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলকে দিয়ে নতুন আরেকটি তিস্তা প্রতিবেদন তৈরি করিয়েছেন। কলকাতা থেকে টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, নতুন এই প্রতিবেদনের মূল কথা হলো— তিস্তার ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ-ভারতের কৃষকরা যতটা সেচের পানি আশা করছেন, আসলে তিস্তায় তার ১৬ ভাগের একভাগ পানিও নেই!
বছর পাঁচেক আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিশিষ্ট নদী বিশেষজ্ঞ ড. কল্যাণ রুদ্রকে দিয়ে একটি তিস্তা প্রতিবেদন তৈরি করিয়েছিলেন। সেই প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য ছিল তিস্তার পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখে কিভাবে বাংলাদেশ-ভারত জল ভাগাভাগির অঙ্ক কষতে পারে তার সুপারিশ করা। কিন্তু ড. রুদ্রর সেই প্রতিবেদন পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখনও প্রকাশ করেনি। কল্যাণ রুদ্রও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে কখনও সেই প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু বাইরে ফাঁস করেননি।
তবে মাসকয়েক আগে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি এটুকু বলতে পারি, আমার প্রতিবেদনে বাংলাদেশবিরোধী কিছু নেই। বাংলাদেশ বঞ্চিত হতে পারে, এমন কিছু আমার সুপারিশে নেই।’
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেই প্রতিবেদনের সুপারিশে সন্তুষ্ট হতে না পেরে নতুন আরেকদল বিশেষজ্ঞকে দিয়ে নতুন একটি রিপোর্ট তৈরি করিয়েছে। এই প্রতিবেদনের কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হয়নি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে তা এরই মধ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন এই রিপোর্টে বলা হয়েছে—
১) ফেব্রুয়ারি থেকে মে— এই শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় এখন পানির পরিমাণ মাত্র একশ কিউসেক। অথচ তিস্তার অববাহিকায় (বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে) যে কৃষকরা বোরো চাষের জন্য তিস্তার সেচের পানির দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাদের মোট চাহিদা অন্তত ১৬শ কিউসেক। অর্থাৎ যে পরিমাণ পানি আছে, চাহিদার তুলনায় তা মাত্র ১৬ ভাগের এক ভাগ।
তিস্তা২) পশ্চিমবঙ্গের পাঠানো এই নতুন প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় সরকারকে এতটাই বিচলিত করেছে যে তারা তিস্তার উজানে সিকিমে তড়িঘড়ি একটি পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছে। আগামী ২৩ এপ্রিল বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্যরা সিকিমে যাবেন। ওই রাজ্যে তিস্তার ওপর স্থাপিত মোট আটটি জলাধার (ড্যাম) ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র তিস্তার প্রবাহকে শুকিয়ে দিচ্ছে কিনা, সেটা খতিয়ে দেখবেন তারা।
৩) নতুন এই বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার মনে করছে, তিস্তায় পানির পরিমাণ এখন এতটাই কম যে সেই পানি ভাগাভাগি নিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি করাটা অর্থহীন হবে। সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে উদ্বৃত করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশকে পানি দিতে চান না, বিষয়টা মোটেও তেমন নয়। কিন্তু তিনি তিস্তার পানি ভাগাভাগির বিরোধিতা করছেন। কারণ এই রিপোর্ট দেখিয়ে দিচ্ছে, তিস্তায় কোনও পানি নেই।’
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়োগ করা এই বিশেষজ্ঞ প্যানেলে কারা ছিলেন সে বিষয়ে কিছু জানাতে পারেনি টাইমস অব ইন্ডিয়া। এটাও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, এই কমিটি কল্যাণ রুদ্রর কমিটির মতো প্রকাশ্যে নয়, কাজ করেছে রীতিমতো চুপিচুপি, সংবাদমাধ্যমকে কিছু না জানিয়েই। প্যানেলের সদস্যরা কারা ছিলেন, সরকার সে সম্পর্কেও কিছু জানায়নি।
বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান অবশ্য এ ব্যাপারে খুব স্পষ্ট। তারা পরিষ্কার বলেছেন, পানির পরিমাণ বিষয় নয়, বিষয়টা হলো দুই দেশের মধ্যে তিস্তার পানি আধাআধি ভাগ হতে হবে।
দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলি বলেন, ‘আট আনা পানি থাকলে চার আনা-চার আনা ভাগাভাগি হতে হবে। আর যদি ছয় আনা পানি থাকে, ভারত পাবে তিন আনা, আমরা পাব তিন আনা। এটা তো খুব সহজ যুক্তি!’
কিন্তু অজানা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে নতুন একটি প্রতিবেদন তৈরি করিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন প্রমাণ করতে চাইছেন, আসলে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় এখন এক আনা পানিও নেই। তাই ভাগাভাগি করারও কোনও প্রশ্ন ওঠে না।
/টিআর/