প্রেস কাউন্সিলের কাজ কী?

জাতীয় প্রেস কাউন্সিলএকের পর এক সাংবাদিক নিগ্রহের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা। ধারাটি জামিন অযোগ্য হওয়ায় সাংবাদিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে সুকৌশলে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ সাংবাদিক ও সংবাদপত্র সংক্রান্ত যে কোনও অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য প্রথম মাধ্যম হওয়া উচিত বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল। কিন্তু সীমিত সক্ষমতার কারণে প্রেস কাউন্সিল কার্যত কোনও ভূমিকা রাখতে পারছে না। আর তাই সাংবাদিক নিগ্রহের জন্য ৫৭ ধারা ব্যবহার হচ্ছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে প্রেস কাউন্সিলের ভূমিকা বারবার উপেক্ষা করা হয়েছে। এটি বন্ধ হওয়া দরকার। এ জন্য প্রেস কাউন্সিলকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
প্রসঙ্গত: গত ১ মে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় গ্রেফতার হন নতুন সময় নামের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের নির্বাহী সম্পাদক আহমেদ রাজু। তার বিরুদ্ধে ওয়ালটন গ্রুপের পণ্য নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ পরিবেশন করার মাধ্যমে কোম্পানির সুনাম ক্ষুণ্নের অভিযোগ আনা হয়। এর আগেও শিক্ষাখাতের দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনের জন্য সাংবাদিক সিদ্দিকুর রহমান খানকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এরও আগে, মুক্তিযোদ্ধা প্রবীর সিকদারের বিরুদ্ধেও মামলা হয় তথ্যপ্রযুক্তি আইনের এই ধারাতেই।
সাংবাদিকদের হয়রানি করতে ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ এবং প্রেস কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক নেতা মনজুরুল আহসান বুলবুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নৈতিকতার মানদণ্ডে কোনটি ঠিক এবং কোনটি ঠিক হয়নি, সেটি প্রেস কাউন্সিল যাচাই-বাছাই করে। এটা কোনও ফৌজদারি আদালত নয়। কাউন্সিল নৈতিকভাবে সংশোধন করার চেষ্টা করে। তারপরও আমাদের দেশের প্রেস কাউন্সিলের ক্ষমতা সীমিত। কাউন্সিল নিজে উদ্যোগী হয়ে কোনও মতামত দিতে পারে না, সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। কোনও সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় মতামত দিতে না পারাটাও প্রেস কাউন্সিলের সীমাবদ্ধতা। এসব বিষয় মাথায় রেখে প্রেস কাউন্সিলের আইন সংশোধন করার জন্য কিছু প্রস্তাব তথ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে কিছুদিন আগে।’
এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে প্রেস কাউন্সিলকে সক্রিয় হয়ে ওঠার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে বলে মনে করেন মনজুরুল আহসান বুলবুল। তিনি আরও বলেন, ‘তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী একটি আইন প্রণয়নের জন্য খসড়াটি দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে আছে। সেটা কার্যকর হলে প্রেস কাউন্সিল নিজস্ব উদ্যোগে কাজ করতে পারবে। কোনও সাংবাদিক নির্যাতিত হলে তখন তিনি নিজে উদ্যোগী হয়েও ব্যবস্থা নিতে পারবেন।’
এদিকে গণমাধ্যমকর্মীরা প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার কথা বারবার বললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, ‘প্রেস কাউন্সিল আইনের অনেক ধারা-উপধারা যেমন অস্পষ্ট, তেমনি কাউন্সিলের বিচার পদ্ধতিও যথাযথ নয়। প্রেস কাউন্সিলকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করতে হবে। কাউন্সিল সরকার ঘেঁষা প্রতিষ্ঠান হলে সাংবাদিক বা নাগরিকরা সুবিচার পাবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারার মতো অনেক ধারা রয়েছে, যেখানে আইনের ব্যাখ্যার অস্পষ্টতা রয়েছে। এটা ব্যবহার করে কোনও সাংবাদিককে হয়রানি করা যায়, গ্রেফতার করা যায়। কাজেই আমার দাবি, সাংবাদিক নেতা ও সুশীল সমাজের সঙ্গে আলোচনা করে ওইসব ধারাকে পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে, যেগুলোকে গণমাধ্যম বা গণমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওপর অপপ্রয়োগ করা যায়। এটা না করতে পারলে এসব ধারার অপপ্রয়োগের সুযোগ থেকেই যাবে।’
এদিকে, বর্তমান সরকারের সময় প্রেস কাউন্সিল অনেক সক্রিয় ও শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের অনেকগুলো মামলার রায় হয়েছে এখানে। আমরা মনে করি, সাংবাদিকদের মামলাগুলো প্রেস কাউন্সিলেই হওয়া উচিত। প্রেস কাউন্সিল যেহেতু একজন বিচারপতির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, তাই কাউন্সিল সঠিকভাবেই মামলার রায় দেয়। কাউন্সিল সক্রিয় হলে এবং যথাযথ উদ্যোগ নিলে সাংবাদিকরা অহেতুক হয়রানির হাত থেকে মুক্তি পাবেন। আর এই সুযোগটি অবশ্যই প্রেস কাউন্সিলকে করে দেওয়া উচিত। কারণ প্রেস কাউন্সিল একটি রেগুলেটরি বডি বলেই আমি মনে করি।’
সাংবাদিকদের নির্যাতন ও হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রেস কাউন্সিলের সচিব শ্যামল চন্দ্র কর্মকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এতদিন কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকলেও আমাদের প্রেস কাউন্সিলের রেগুলেশনে বড় পরিবর্তন এসেছে। আমরা আইনে একটি সংশোধনী এনেছি। যেটা সব সাংবাদিক বন্ধুদের জন্য আজ সুখবর।’
তিনি আরও বলেন, এতদিন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রেস কউন্সিলে মামলা ও অভিযোগ আসত। কিন্তু সাংবাদিকরা সমস্যায় পড়লে কী হবে তা স্পষ্ট ছিল না। আমরা সে জায়গায় পরিবর্তন এনেছি। সাংবাদিকরা যদি তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনও ধরনের নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হন তাহলে তারা প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ করতে পারবেন। প্রেস কাউন্সিল অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে। এ বিষয়ে খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। চলতি মে মাসের মধ্যে এটা সবাইকে জানাবো এবং প্রতিটি সংবাদপত্র হাউজে এই খসড়ার কপি দেওয়া হবে। যাতে সাংবাদিকরা তাদের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় যদি সাংবাদিকরা হুমকির সম্মুখীন হন তাহলে সেটা গণতন্ত্র বিকাশ ও স্বাধীন সংবাদপত্রের অন্তরায়। আমাদের এ সংশোধনী সাংবাদিকদের রক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করবে।’

আরও পড়ুন-

মুক্ত সাংবাদিকতার হুমকি ৫৭ ধারা

আজ মুক্ত গণমাধ্যম দিবস: মুক্ত নয় গণমাধ্যম

মুক্তচিন্তা বাধাগ্রস্ত হয় এমন সম্প্রচার নীতিমালা হবে না: ইনু

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মুক্তভাবে কথা বলার সুযোগ থাকবে: আইনমন্ত্রী

/এসএনএইচ/টিআর/এসএমএ/টিএন/