‘সস্তায় এত ভালো সেবা অন্য কোথাও নেই’

১০০ শয্যার মা ও শিশু হাসপাতাল

‘হাসপাতালটির ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। বড় মাঠ, নানা রকমের গাছ আর এতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কোনও সরকারি হাসপাতাল হতে পারে সেটা এখানে না এলে জানতেই পারতাম না। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারও অন্য হাসপাতালের সঙ্গে চোখে আঙ্গুল দিয়ে পার্থক্যটা বুঝিয়ে দেয়।’ বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন সাংবাদিক রাজু হামিদ।

রাজু বলেন, ‘আমার সন্তানের জন্ম হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। তাতে করে আমার খরচ হয়েছিল মোট আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। আর এই টাকাটাও আমি কারও হাতে দেইনি, বেশিরভাগই ওষুধসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে খরচ হয়েছে। আবার যেসব ওষুধ আমার স্ত্রীর দরকার হয়নি, সেগুলোও তারা ফেরত দিয়েছেন।’ মোটকথা হাসপাতালটি অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের তুলনায় অনেক বেশি ভালো, বলেও মন্তব্য করেন সাংবাদিক রাজু।

কেবল রাজু নন, রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত ১০০ শয্যার মা ও শিশু হাসপাতাল নিয়ে এমনই বক্তব্য এখানে আসা প্রায় প্রতিটি মানুষের। হাসপাতালটির পোষাকি নাম ‘মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এবং ১০০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতাল’ হলেও স্থানীয়ভাবে এটি ‘মা ও শিশু হাসপাতাল’ নামেই পরিচিতি লাভ করেছে। মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোড ও তাজমহল রোডের মাঝামাঝিতে হাসপাতালটি অবস্থিত।

unnamed (2)

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছয়তলা হাসপাতালের প্রতিটি ফ্লোর ঝকঝকে। সরকারি অন্য হাসপাতালগুলোর মতো এখানে কোথাও পানের পিক নেই, নেই থুথু, কোনও প্লাস্টিকের বোতল কিংবা কাগজের টুকরো। শিশু ইউনিটে ঢুকে যায়, চারপাশে নানা রকম পাখি, ফুল, ফলের ছবি দিয়ে সাজানো। লেখা রয়েছে বাংলা মাসের নাম, সপ্তাহের সাত দিনের নামসহ শিশুদের উপযোগী নানাকিছু। সাড়ে নয় বছরের ঐশ্বর্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলে, ‘এগুলো দেখতে দেখতে সময় চলে যায়, এতো সুন্দর হাসপাতাল।’

ছয়তলা ভবনটির নিচতলায় ইপিআই কার্যক্রম, বর্হিবিভাগ, সমাজসেবা, দ্বিতীয়তলায় প্রসবপূর্ব এবং প্রসব পরবর্তী চিকিৎসা, সব ধরণের পুষ্টি, ল্যাবরেটরি, নারী এবং পুরুষদের বন্ধ্যাকরণ সর্ম্পকিত চিকিৎসা, কিশোরী মায়েদের কাউন্সিলিং, তৃতীয় তলায় আলট্রাসনোগ্রাম এবং প্রসবকালীন সেবা, চতুর্থতলায় প্রশিক্ষণ, পঞ্চম তলায় মায়েদের কেবিন এবং ওয়ার্ড, শিশুদের ওয়ার্ড, শিশু ইউনিটের ভেতরেই তিন বেড নিয়ে কেএমসি (ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার) করা হয়েছে।

unnamed (4)

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ১৯৭৪ সালে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের অধীনে মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারটি নির্মিত হয়। ১০০ শয্যার মা ও শিশু হাসপাতাল চালু করা হয় ২০১০ সালে। এখানে পরিবার পরিকল্পনা সেবা, শিশুদের টিকাদান, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, সন্তান প্রসবসহ মা ও শিশুদের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। প্রতিদিন প্রায় মা ও শিশু মিলিয়ে প্রায় ৬০০ জন রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন, আর প্রতিমাসেই রোগী ভর্তি থাকে প্রায় সাড়ে তিনশোর মতো। ১২ জন মেডিক্যাল অফিসার, চারজন কনসালটেন্ট, দুইজন সিনিয়র কনসালটেন্টসহ মোট ১৫২ জনের মতো চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন রোগীদের।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. মুনীরুজ্জামান সিদ্দিকী জানান, সরকার নির্ধারিত যেসব পরীক্ষা এখানে হয় সেগুলোর সবই হয় সরকার নির্ধারিত খরচে, এর বাইরে কোনও টাকা নেওয়া হয় না। এর মধ্যে আউটডোর টিকিট ৫ টাকা এবং ভর্তি হলে ১০ টাকার টিকিট কাটতে হয়। আর যদি কেবিন ভাড়া নিতে হয় তবে খাবারসহ ২৫০ টাকা আর কেবিনে থাকা অবস্থায় যদি স্বাভাবিক প্রসব হয় তাহলে কোনও চার্জ হবে না, কেবলমাত্র অস্ত্রোপচার হলে অপারেশন থিয়েটারের জন্য সরকার র্নিধারিত ২০০০ টাকা খরচ হয়। অপরদিকে, ওয়ার্ডে থাকা কোনও নারীর যদি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব হয় তাহলে তার অপারেশন থিয়েটারের খরচ দিতে হবে না, সব ফ্রি। আলট্রাসনোগ্রামে, হোল অ্যাবডোমেন ১২০ আর লোয়ার অ্যাবডোমিন ১১০ টাকা।

unnamed (1)

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা জামেলা খাতুন বলেন, ‘হাসপাতালের সবার ব্যবহার খুব ভালো, বিশেষ করে নার্সরা খুবই আন্তরিক। সরকারি হাসপাতালগুলোতে নার্স, আয়াদের কতো বদনাম শুনেছি, কিন্তু এখানে এসে মনেই হয়নি এটা সরকারি হাসপাতাল। একইসঙ্গে হাসপাতালের খরচও অনেক অনেক কম। আমাদের মতো মানুষদের জন্য এতো ভালো সেবা অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না।’

পরিচালক ডা. মুনীরুজ্জাম্মান সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সবকিছু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেও আমাদের অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে একটি, আর একটি হলে খুব ভালো হয়। আমরা আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে আবেদন করেছি কিন্তু এখনও সেটি পাইনি। অপরদিকে, হাসপাতালের প্রবেশমুখে থাকা ডাস্টবিনটি সরানোর জন্য একাধিকবার আবেদন করা হলেও কর্তৃপক্ষ সেটি আমলে নেয়নি।’

 /এমও/