ফরেনসিক আলামত ছাড়াও ধর্ষণ প্রমাণ সম্ভব

86162_1

ধর্ষণের ঘটনায় সাধারণত অতিদ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষার দরকার হলেও এ ধরনের আলামত ছাড়াও তা প্রমাণ সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ অনুযায়ী ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণে এমন ঘটনার শিকার নারীর জবানবন্দিই যথেষ্ট। আইনজ্ঞরা বলছেন, ‘সুষ্ঠু তদন্ত এবং পারিপার্শ্বিক ঘটনা দিয়ে যে কোনও অপরাধই প্রমাণ করা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনাও ব্যতিক্রম নয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনায় যত দ্রুত পরীক্ষার জন্য আসবে ততই আলামত পাওয়া আমাদের জন্য সুবিধাজনক হয়। আর যদি বড় ধরনের কোনও ইনজুরি থাকে তাহলে হয়তো সেটা ৫-৬ দিনের মতো থাকে। তবে কয়েকদিনের মধ্যেও ওই ইনজুরি ঠিক হয়ে যেতে পারে। তাই বলা যায়, সময়ের গড়ানোর সঙ্গে আলামত নষ্ট হতে থাকে।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শারীরিক আলামত পাওয়া না গেলেও পারিপার্শ্বিক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করা অসম্ভব কিছু নয়। তবে এজন্য দরকার সুষ্ঠু তদন্ত এবং তদন্ত প্রতিবেদন।’

প্রসঙ্গত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ এনে গত ৬ মে বনানী থানায় একটি মামলা দায়ের করে। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ মার্চ পূর্বপরিচিত সাফাত আহমেদ ও নাইম আশরাফ ওই শিক্ষার্থীদের জন্মদিনের দাওয়াত দেয়। ওইদিনই তারা ওই ছাত্রীদের বনানীর কে-ব্লকের ২৭ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বরে দ্য রেইনট্রি হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে জন্মদিনের অনুষ্ঠান চলাকালীন দুই তরুণীকে হোটেলের একটি কক্ষে আটকে রেখে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ধর্ষণ করে মামলার দুই আসামি।

পরদিন বিষয়টি জানাজানি হলে হত্যার পর লাশ গুম করার ভয় দেখিয়ে দুই শিক্ষার্থীকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দুই তরুণী স্ব স্ব বাসায় ফিরে আসে। প্রথমে ভয়ে বিষয়টি কাউকে না জানালেও পরে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তারা মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আসামিরা প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায় বনানী থানা পুলিশ প্রথমে তাদের মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

রবিবার (৭ মে) ধর্ষণের শিকার দুই তরুণীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে। সেখানে তাদের ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ড. সোহেল মাহমুদকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। অন্য সদস্যরা হলেন মমতাজ আরা, নীলুফার ইয়াসমিন, কবিতা সাহা ও কবির সোহেল।

তরুণীদের ফরেনসিক পরীক্ষার বিষয়ে ডা. সোহেল মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভিকটিমদের মাক্রোবায়োলজি, রেডিওলজিক্যাল এবং ডিএনএ প্রোফাইলিং পরীক্ষার জন্য আনা হয়েছে। পরীক্ষা শেষে প্রতিবেদন পেতে ১৫-২০ দিন সময় লাগবে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যাবে।’

তবে ফরেনসিক আলামত ছাড়াও ধর্ষণের ঘটনায় অনেক দৃষ্টান্তমূলক রায়ের উদাহরণ দক্ষিণ এশিয়ায় রয়েছে জানিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীর কথাই মুখ্য। একই সঙ্গে পারিপার্শ্বিক তথ্যউপাত্তও কাজে আসে। ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য পর্যাপ্ত আলামতের অভাবে আসামিদের পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’

ঘটনার দিনের পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলেই এ মামলার অনেক প্রমাণাদি পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন সালমা আলী। তিনি আরও বলেন, ‘সেদিনের সবকিছুই তো আর উধাও হয়ে যায়নি ঘটনাস্থল থেকে। একই সঙ্গে সাক্ষী এবং অন্যান্য প্রমাণ যদি সঠিকভাবে পাওয়া যায় তাহলে এ ঘটনা প্রমাণ করা সম্ভব। যেহেতু তারা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে গিয়েছিল তাই আমরা আশা করছি, এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত হবে। প্রাথমিকভাবে মেয়েরা নিজেদের গোপনীয়তার কথা ভেবে চুপ ছিল। কিন্তু তাদের ব্ল্যাকমেইলিং করায় আইনের আশ্রয় নিয়েছে তারা।’

এদিকে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবীর সদস্য অ্যাডভোকেট দিলরুবা শারমীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও নারী যখন ধর্ষণের অভিযোগ আনে তখন সেখানে কোনও তথ্যউপাত্তের দরকার হয় না। তার জবানবন্দিই এক্ষেত্রে যথেষ্ট। উচ্চ আদালতের অনেক মামলার রায়ে ও পর্যবেক্ষণে একথা বলা হয়েছে।’

হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি রোগবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনায় আলামত সংগ্রহ করতে হয় দ্রুত, তা না হলে আলামত নষ্ট হয়ে যায়। তবে এ ধরনের ঘটনায় যদি গুরুতর ইনজুরি থাকে তাহলে অনেক সময় সেগুলো থেকেই যায়। সেরকম কিছু যদি এই দুই তরুণীর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে তাহলে আলামত সংগ্রহ করা অসম্ভব নয়।’

/জেএইচ/