‘জ্যাক অব অল ট্রেড’

বৃতকুাব

ছোটবেলায় যখন প্রবাদবাক্য শুনতাম, তখন জোর করে মনে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতাম। তবে আমার প্রিয় বিষয় ছিল খনার বচন। না, এতে আমি কোনও বিপ্লব তখনও খুঁজিনি। খনার কথাগুলো বারবারই ব্যাখ্যাসহ বুঝিয়ে দিতেন বাবা। মিলিয়ে দেখতাম। আগের বছর শেখা কোনও একটি প্রবাদবাক্য পরের বছর মিলিয়ে নিতাম। মিলতো, আনন্দ হতো খুব। ছেলেবেলার আনন্দ। এই সবকিছুর মধ্যে অষ্টম শ্রেণিতে যখন আমি, তখন একজন গৃহশিক্ষক এলেন। তিনি দেখলেন, আমি দুষ্টুমি যাই করি না কেন, রেজাল্ট খারাপ হয় না। শুরুর দিকেই জানতে চাইলেন অবসরে তুমি কী করো? বললাম, গান করি, কবিতা পড়ি, ডিটেকটিভ গল্প পড়ি। কবিতা লিখি কিনা, জানতে চাইলে স্পষ্ট মনে আছে বলেছিলাম, ইচ্ছা হয়নি এখনও। তিনি মনোযোগ দিয়ে জানতে চাইতেন, কোন বইটি পড়তে ভালো লাগছে? কোন বইতে নতুনভাবে ভাষাকে আবিষ্কার করা যায়?

আমি অর্ধেক বুঝতাম, অর্ধেক বুঝতাম না। আমি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। আর এই আমাকেই তিনি রোজই কোনও না কোনও বিষয়ে এক পাতা লিখতে দিতেন। আমার একইসঙ্গে পড়ালেখা, গান, বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হাজির হওয়ার সব গল্প শুনে একদিন বললেন, তুমি তো শুনেছি অনেক প্রবাদবাক্য পছন্দ করো। জ্যাক অল ট্রেড, মাস্টার অব নান- এটা কখনও শুনেছ? না শুনলে ক্ষতি নেই, এই কনফিডেন্সের জায়গা থেকে বললাম, শুনিনি। তিনি বিষয়টা বুঝিয়ে শেষ করতে পারেননি তখনও, আমি প্রায় চিৎকার দিয়ে বললাম, সে কী, এটা তো ভালো না, খারাপ। কিন্তু আমাকে তো সবকিছুতেই ভালো-সেরা বলে সবাই। তিনি বললেন, বেশিদিন সবকিছুতে সেরা থাকা যায় না, তুমি মনোযোগ দিয়ে সব একসঙ্গে করতে পারবে না। অনেকদিন পর সেই শিক্ষককে আবারও মনে পড়ছে। সময় দ্রুত বদলায়। খনার বচনগুলো এখন আর মৌসুমে মেলে না। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের দিনকালও বদলে গেছে। এখন  ‘জ্যাক অব অল ট্রেড’-এর সময়। তবে শেষ অংশটায় কারেকশন আছে। ‘মাস্টার অব নান’-এর জায়গায় নিজ যোগ্যতায় ‘মাস্টার অব সাম’ লাগাতে চাই আমি। আমার এই অনুধাবন অনলাইনে কাজ করতে এসে। অনলাইন মাধ্যমে সাংবাদিকতা করার সবচেয়ে জরুরি দিক হলো: খবর রাখা, কেবল নিজে যে বিশেষ বিটে কাজ করি সেই বিটের না মোটামুটি সবটার। ছাপা কাগজের সাংবাদিকতার সঙ্গে এর বিস্তর ফারাক। দু’টি ভিন্ন ভিন্ন জরুরি মাধ্যম, যেখানে কাজের প্রক্রিয়াও ভিন্ন। কাগজে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আপনি ভালো সাংবাদিক তখনই, যখন আপনি সেরা কাজটি অন্য কারও চেয়ে আলাদাভাবে হাজির করতে পারছেন। আর অনলাইনে আপনি কেবল সেরা কাজটি দিতে পারছেন, এর ওপর নির্ভর করবে না আপনার শ্রেষ্ঠত্ব, সবার আগে সঠিকভাবে দিতে পারছেন কিনা, সেটাও জরুরি।

একজন প্রতিবেদক একইসঙ্গে স্পট থেকে বলবেন, ছবি তুলবেন, দরকার থাকলে ভিডিও করবেন, অফিসে এসে দিনের ফলোআপ দিনেই লিখবেন। এই চ্যালেঞ্জ নিতে হলে আপনার সেই আগ্রহের জায়গা থাকতে হবে। আরেকটি বিষয় অনলাইনে জরুরি। তা হলো টিমওয়ার্ক। এখানে কোনও নির্দিষ্ট সেকশনের টিমওয়ার্ক আলাদা করার সুযোগ নেই। প্রতিটি সেকশন অন্য সেকশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রিপোর্টিং-ডেস্ক-গ্রাফিক্স মিলে রিপোর্ট প্রস্তুত করবেন, একই সময়ে সিদ্ধান্ত হবে সেটির ট্রিটমেন্ট। এরপর আপলোডের কাজ। সবকিছুর সঙ্গেই সবার সেঁটে থাকার বিষয় আছে। আপনি যদি চান আপনার কাজটি পরিপাটি হোক, তাহলে সবকয়টি কাজ আপনি যখন করে উঠতে পারবেন, কেবল তখনই আপনি একজন অনলাইন সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে দাবি করতে পারবেন। এছাড়া প্রতিনিয়তই নিজেকে নবায়ন করতে হবে, অতিক্রম করতে হবে অন্য অনেক কিছুই সঙ্গে নিজেকেও। তাহলেই আপনি ‘মাস্টার অব সাম’-এর সুবিধা নিতে পারবেন।

/এমএনএইচ/আপ- এপিএইচ/