এর আগে, এই মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ১২ জন আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেন। তাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ১০ জন। এর মধ্যে কামাল হোসেন, এম আমীর-উল ইসলাম, টি এইচ খান, এ এস হাসান আরিফ, রোকন উদ্দিন মাহমুদ, আবদুল ওয়াদুদ ভূইয়া, এম আই ফারুকী, এ জে মোহাম্মদ আলী ও ফিদা এম কামাল সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানান। আর ষোড়শ সংশোধনী যথাযথ ছিল বলে মনে করেন আজমালুল হোসেন কিউসি। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ এ বিষয়ে কোনও বক্তব্য রাখেননি।
২০১৪ সালে সংবিধানের ওই সংশোধনীর পর সুপ্রিম কোর্টের নয় জন আইনজীবীর করা একটি রিট আবেদনে গত বছর হাইকোর্ট সংসদের ওই পদক্ষেপকে অবৈধ বলে রায় দেন।
এদিকে, অ্যাটর্নি জেনারেল মনে করেন, দেশের জনগণের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সংশোধনী (ষোড়শ সংশোধনী) হয়েছে। আর এই সংশোধনীকে যথাযথ উল্লেখ করে উচ্চ আদালতের বিচাপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকা উচিত বলে মত দিয়েছেন সিনিয়ন আইনজীবী অ্যামিকাস কিউরি আজমালুল হোসেন কিউসি। আদালতে শুনানিকালে উপস্থাপন করা মন্তব্য নিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী যথাযথ, এটা সংসদের এখতিয়ারের মধ্যে। এখানে কোনও ভুল-ত্রুটি নাই। আর এটাকে বাতিলও করা যাবে না।’
সংসদের হাতে এই দায়িত্ব দেওয়া হলে স্বাধীন বিচার বিভাগের ওপর আঘাত আসবে কিনা জানতে চাইলে সাংবাদিকদের আজমালুল হোসেন বলেন, ‘এখানে স্বাধীন বিচার বিভাগের কোনও সমস্যা নাই। আমাদের সংবিধানের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যেটা আছে সেটা লিমিডেট, অ্যাবসলুট না। যদি রাষ্ট্রপতিকে ইম্পিচমেন্ট (অপসারণ) করতে হয়, সেটা কিন্তু সংসদে হবে। সংসদ তো এখানে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে গিয়ে বিচার করল। একইভাবে একজন বিচারপতিকেও যদি অপসারণ করতে হয়, একই জিনিস করবে। সংসদেরও কিছু কিছু বিচার করার কাজ আছে।’
মতামত দিতে গিয়ে ড. কামাল হোসেন সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলকে সক্রিয় করার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদাকে খাটো করেছে। কোনও ধরনের আইন বা সংশোধনী সংবিধানের পরিপন্থী হলে কোনটা প্রাধান্য পাবে? এটা খুব সহজ ব্যাপার— একদিকে সংবিধান, অন্যদিকে সংশোধনী। অবশ্যাই সংবিধান প্রাধান্য পাবে।’
শুনানি শেষে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে সংসদের মাধ্যমে বিচারকের অপসারণ পদ্ধতি রয়েছে। সেসব দেশে বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই প্রক্রিয়া সফল হয়নি। নির্বাচনি বিরোধ নিয়ে যেসব মামলা হয়, সেগুলোর শুনানি ও নিষ্পত্তি হয় হাইকোর্টে। এসব মামলার নিষ্পত্তি করেন বিচারকরা। এখন বিচারকদের অপসারণের বিষয়টি সংসদের হাতে চলে গেলে তা ভারসাম্য নষ্ট করবে এবং বৈপরীত্য তৈরি করবে।’
আবার, ষোড়শ সংশোধনীর পক্ষ নিতে গিয়ে আজমালুল হোসেন কিউসি বলন, ‘জনপ্রতিনিধিরা জাতীয় সংসদে জনগণেরই প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। ফলে ষোড়শ সংশোধনী ওই জায়গাতেই নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সংসদের কাছে জবাবদিহিতা থাকবে।’ তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘এই সুপ্রিম কোর্টের একটি প্রশাসনিক ভবন নেই। সুপ্রিম কোর্টের অনেক কর্মকর্তার বসার কক্ষ নেই। অথচ দেশে বিচার বিভাগের অবদান কোনও অংশেই কম নয়। আমরা বিচার করি বিচার বিভাগের স্বার্থে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে। জনগণের স্বার্থ জড়িত থাকলে যত ক্ষমতাশালীই থাকুক না কেন, বিচারকরা বিচারকাজ চালিয়ে যান।’
ফিদা এম কামাল আদালতে বলেন, ‘বিচারক অপসারণে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি সেটেল্ড ইস্যু। এরই মধ্যে উচ্চ আদালতের দু’টি রায়েও এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ওই রায়ের আলোকেই সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি বহাল রাখা হয়েছিল।’ এ জে মোহাম্মদ আলী শুনানিতে তার মতামত দিতে গিয়ে বলেন, ‘সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ থাকায় দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ চলে যায়। এটা থাকার কারণে ইচ্ছা থাকার পরও সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে নিজ দলের বিরুদ্ধে মতামত দিতে পারেন না।’
প্রধান বিচারপতি ছাড়া বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন— বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। বিলটি পাসের পর ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।
সংবিধানের এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরের ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়। ওই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের পাঁচ মে ওই সংশোধনীকে বাতিল ও সংবিধান পরিপন্থী বলে রায় দেন হাইকোর্ট।
/ইউআই/টিআর/