বাকস্বাধীনতা বন্ধ করে আইন দিয়ে সমাজকে সুরক্ষা সম্ভব নয়

‘সোশ্যাল মিডিয়া ও কথা বলার স্বাধীনতা’ শীর্ষক বৈঠকিপ্রতিবাদের প্ল্যাট ফর্ম হয়ে উঠছে সোশ্যাল মিডিয়া। কথা বলার স্বাধীনতা না থাকলে গণতন্ত্র বাস্তবায়ন অসম্ভব। সমাজে বাকস্বাধীনতা থাকতে হবে। বাকস্বাধীনতা আটকে রেখে আইন দিয়ে সমাজের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।‘সোশ্যাল মিডিয়া ও কথা বলার স্বাধীনতা’ শীর্ষক বৈঠকিতে এসব কথা বলেন আলোচকরা। বৃহস্পতিবার (৮ জুন) বিকালে বাংলা ট্রিবিউন কার্যালয়ে এ বৈঠকি অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ এই বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করে এটিএন নিউজ।

মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় বৈঠকিতে অংশ নেন সাবেক তথ্য কমিশনার সাদেকা হালিম, সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা, আইনজীবী রুমীন ফারহানা, বিডি জবস সিইও ও তথ্য প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ফাহিম মাশরুর, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের শিক্ষক সুমন রহমান, বাংলা ট্রিবিউনের প্রকাশক কাজী আনিস আহমেদ ও সম্পাদক জুলফিকার রাসেল।

কাজী আনিস আহমেদবাংলা ট্রিবিউনের প্রকাশক কাজী আনিস আহমেদ বলেন, ‘কথা বলার স্বাধীনতা অনেকের কাছে বড় বিষয় নাও মনে হতে পারে। কেউ কেউ মনে করতে পারেন, কিছু লোক বেশি বেশি কথা বলে। এত কথা বলার কী আছে। এই পরিস্থিতির বিপরীতে আমরা বলতে চাই, কথা বলার স্বাধীনতা না থাকলে গণতন্ত্র বাস্তবায়ন অসম্ভব। দেশে গণতন্ত্র আছে কিনা, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু বড় বিষয় হচ্ছে আমরা গণতন্ত্র আশা করি কিনা। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার অপব্যবহার দেখছি। নামকরা সম্মানী ব্যক্তিদের হেনস্তা হতে দেখছি। ফেসবুকে কমেন্ট করে কারও কারও  জেল হাজতে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।’

কাজী আনিস আহমেদ বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া ট্রল হয়, তেমনি অনেক গণসচেতনা তৈরি হয়। তনু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যেতে পারতো, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে সবাই সচেতন। সোশ্যাল মিডিয়া সত্য প্রকাশ করেছে, তখন অপরাধী ছাড়া কারও ক্ষতি হচ্ছে না। আবার মিথ্যার মাধ্যমে কেউ কেউ নিগৃহীত হচ্ছে। আইন হওয়া উচিত, যে সহজে সুরক্ষা পায় না তার সুবিধার জন্য। ’

কাজী আনিস আহমেদ বলেন, ‘মানুষ যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় যায় তখন ভিন্ন আচরণ করে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে ঘরে বসে পাবলিক ফোরামে অংশ নেওয়া যায়। এ কারণে সোশ্যাল মিডিয়া শক্তিশালী। আমাদের আরও ডিজিটাল শিক্ষা দরকার। মানুষকে শেখাতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা দরকার। আমাদের অধিকার সচেতন ও সহনশীল হতে হবে। যার যার অনুভূতি তাকে সামলাতে হবে। কার অনুভূতি কিভাবে অনুভূত হবে সেটা আইন দিয়ে বিচার করা কঠিন। কেউ কাউকে হুমকি দিতে পারে না।’

সাদেকা হালিমসাবেক তথ্য কমিশনার সাদেকা হালিম বলেন, ‘তথ্য অধিকার আইন সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত নয়। আজকেই শুনলাম, চয়ন নামে একটি ছেলে, যার বয়স ১৮ বছরের নিচে, তাকেও আইসিটি আইনের আওতায় আনা হয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনেক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তথ্য অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন।’

সাদেকা হালিম বলেন,  ‘বর্তমান বাংলাদেশে বড় দুর্বলতা সুশাসন। অতীতে আমরা পেশাজীবী ও রাজনৈতিক দলকে প্রতিবাদ করতে দেখেছি। এখন সেই প্রতিবাদের প্ল্যাট ফর্ম হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। আমাদের গবেষণার প্রয়োজন। যখন সুলতানা কামালকে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করা হলো, সেটি সরকারের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। সুলতানা কামাল জনমত তৈরি করেন। হেফাজত তার ওপর আঘাত করছে। আমাদের দেশে ৭৩ শতাংশ নারী সাইবার ক্রাইমের শিকার হচ্ছেন ।’ 

রুমীন ফারহানাআইনজীবী রুমীন ফারহানা বলেন, ‘আইসিটির অ্যাক্টের পুরো আইনটি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। আমরা দেখছি, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্যদের নিয়ে কেউ মন্তব্য করলে ৫৭ ধারার আওতায় যাচ্ছে। ৫৭ ধারাটি অস্পষ্ট। এটি ব্যাখার দাবি রাখে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে আমরা জাতি হিসেবে এখনও দক্ষ হয়ে উঠিনি। কি কমেন্ট করা উচিত সে বোধ এখনও তৈরি হয়নি।’

রুমীন ফারহানা বলেন, ‘বাংলাদেশে মামলা করা দুরূহ কাজ। সময়, অর্থ ব্যয় করে আদালতে ঘুরাঘুরি করতে হয়। আমাদের বিচার ব্যবস্থা প্রভাবশালীদের পক্ষে থাকে। ’

আইন দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব নয় বলেও মত দেন রুমীন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘অনাদিকাল থেকে  আইন আছে, আদালত আছে, অপরাধ কিন্তু বন্ধ হয়নি। এ জন্য পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ দরকার। আমাদের মিডিয়া একটা সেন্সরশিপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া বড় ভূমিকা পালন করে। অনেক খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় আগে আসে। আমাদের সামাজিক ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত হতে হবে। কী লিখবো, কী মন্তব্য করবো ভেবে নেওয়া উচিত। একটি মন্তব্য সারা বিশ্বের কাছে প্রকাশ হচ্ছে।’

জুলফিকার রাসেলবাকস্বাধীনতা কতটুকু বলা পর্যন্ত, এমন প্রশ্ন করেন বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল । জবাবে আইনজীবী রুমীন ফারহানা বলেন, ‘রাষ্ট্র হুমকিতে পড়ে এমন কথা কেউ বলতে পারে না। নৈতিকতা পরিপন্থী ও আদালতের মানহানি হয়, এমন কিছু বলতে পারবেন না।’

বিডি জবস সিইও ও তথ্য প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘যখন আইনটি করা হয়ছিল, তখন সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপ্তি নিয়ে ভাবা হয়নি। চায়ের আড্ডায় আমার যেমন কথা বলি, তেমন করে সোশ্যাল মিডিয়ায়ও কথা বলি। বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার জন্য যদি আইনের আওতায় না আসতে হয়, তবে কেন সোশ্যাল মিডিয়ায় কথা বলার জন্য আইনের আওতায় আনা হবে।’

ফাহিম মাশরুরফাহিম মাশরুর আরও বলেন, ‘সমাজে বাকস্বাধীনতা দিতে হবে। বাকস্বাধীনতা আটকে রেখে আইন দিয়ে সমাজকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।সোশ্যাল মিডিয়া পশ্চিমা দেশ থেকে আসছে, আমাদের দেশে এখন সেই অবস্থা তৈরি হয়নি,এজন্য সময় দিতে হবে।’  

গোলাম মোর্তোজাসাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের সংবিধানে বিশ্বাসী। ৫৭ ধারা বাংলাদেশের সংবিধানবিরোধী। আমি এ আইনটি বাতিল চাই।  আমরা সুযোগ পেলে বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দেই, ভারতেও এই আইনটি ছিল। কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতাবিরোধী হওয়ায় ভারতের আদালত তা বাতিল করে দেয়। এ উদাহরণ বাংলাদেশের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। এ আইনটি কোনও সভ্য দেশের আইন হতে পারে না। এ আইনটি এত ভয়ঙ্কর যে, একজন খুন করলো, তাকে খুনি বললে আইনের আওতায় সাত বছর জেল হবে। এ ধারাটি রেখে কোনও দেশ বলতে পারে না -মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে।’

কেউ যদি হিট স্পিচ দেয় তবে সেটা কিভাবে প্রতিরোধ করা যাবে- বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেলের প্রশ্নের জবাবে গোলাম মোর্তোজা বলেন, ‘এটি একটি গবেষণার বিষয়। এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা ব্যবস্থা তৈরি হবে। তবে এজন্য ৫৭ ধারার দরকার নেই।’

অনেকেই বাজে মন্তব্য করেন উল্লেখ্য করে গোলাম মোর্তোজা বলেন, ‘চাইলে ৫৭ ধারায় মামলা করা যায়। কিন্তু আমি মামলা করতে চাই না। আমি এই আইনের বিরুদ্ধে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অনেক বেশি শক্তিশালী।’

সুমন রহমানইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের শিক্ষক সুমন রহমান বলেন, ‘ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার আগে আমি ৩০০ বার ভাবি। কিন্তু একটি পত্রিকায় কলাম লিখতে গেলে ভাবি না। ৫৭ ধারা প্যানিক সৃষ্টি করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার অনেক লেয়ার আছে, আমরা সেটা জানি না। সোশ্যাল মিডিয়া জিনিসটা কী, সেটা বোঝা উচিত।  ফেসবুক আমার তথ্য সংগ্রহ করে, সেটা নিয়ে তারা ব্যবসা করে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে জানতে পারছি। ফ্যাসিজম তৃণমূলে ছড়িয়ে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া এখন সরকারের সার্ভিল্যান্স মাধ্যম হয়েছে।’

বৈঠকি সঞ্চালনা করেন মুন্নী সাহাবাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল বলেন, ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রয়োজন আছে, তবে অন্যের বিশ্বাসকে আঘাত করে কিংবা করুচিপূর্ণ মত প্রকাশ উচিত নয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দরকার, না হলে সমাজের যথাযথ চিত্র উঠে আসবে না।’

/সিএ/ এপিএইচ/