সিভিল এভিয়েশন সূত্র জানায়, তিন বছরের জন্য এই লাইসেন্স দেওয়া হবে। তিন ধরনের লাইসেন্স দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে খসড়া প্রস্তাবে। এই খসড়া প্রস্তাবনা অনুযায়ী, এ-ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স পেলে দেশের সব বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে সব এয়ারলাইন্সকে সেবা দেওয়া সুযোগ থাকবে। বি-ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠান সেবা দিতে পারবে কেবল দেশি এয়ারলাইন্সকে। আর সি-ক্যাটাগরিতে দেশি এয়ারলাইন্সগুলো নিজস্ব ফ্লাইটের গ্রাউন্ড সার্ভিস করতে পারবে, যে বিধান এখনও বিদ্যমান রয়েছে।
সূত্র জানায়, এ-ক্যাটাগরির জন্য দুইশ কোটি টাকা ও বি-ক্যাটাগরির জন্য ৫০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন রাখার বিধান রাখা হয়েছে। এই মূলধনের ৫ শতাংশ সিভিল এভিয়েশনের কাজে নিরাপত্তা জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে। দেশি প্রতিষ্ঠানকে জয়েন্ট স্টকে কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত থাকতে হবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ ব্যবস্থাপনা থাকলে ৫১ শতাংশ শেয়ার থাকতে হবে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের। এর বাইরে যেকোনও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই বছর গ্রাউন্ড সার্ভিসের অভিজ্ঞতা থাকা প্রতিষ্ঠান এ-ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স আবেদন করতে পারবেন। তবে কোনও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ ব্যবস্থাপনায় থাকলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দু’টি ভিন্ন দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দিনে কমপক্ষে ৩০টি উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড সার্ভিসের নূন্যতম পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বি-ক্যাটাগরির ক্ষেত্রেও তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দিনে কমপক্ষে ২০টি উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড সার্ভিসের দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
ফি ও চার্জ বিষয়ে সিভিল এভিয়েশনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এ-ক্যাটাগরিতে শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জন্য লাইসেন্স ফি ১০ কোটি টাকা, নবায়ন ফি ৫ কোটি টাকা। এই ক্যাটাগরিতে সিলেটের ওসমানী, চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও কক্সবাজার বিমানবন্দরের জন্য লাইসেন্স ফি ৫ কোটি টাকা, নবায়ন ফি ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরের জন্য লাইসেন্স ফি ১ কোটি টাকা, নবায়ন ফি ৫০ লাখ টাকা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সিভিল এভিয়েশনকে মাসিক ২৫ শতাংশ রয়েলটি দিতে হবে।
বি- ক্যাটাগরির ক্ষেত্রে শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জন্য লাইসেন্স ফি ৫ কোটি টাকা, নবায়ন ফি ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই ক্যাটাগরিতে সিলেটের ওসমানী, চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও কক্সবাজার বিমানবন্দরের জন্য লাইসেন্স ফি ৩ কোটি টাকা, নবায়ন ফি ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরের জন্য লাইসেন্স ফি ৫০ লাখ টাকা, নবায়ন ফি ২৫ লাখ টাকা। এই ক্যাটাগরির প্রতিষ্ঠানকেও সিভিল এভিয়েশনকে মাসিক ২৫ শতাংশ রয়েলটি দিতে হবে।
প্রতিবছর লাইসেন্স পাওয়া গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবার মানের অডিট করবে সিভিল এভিয়েশন। এছাড়া, এসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট দ্বারা নিরীক্ষা করতে হবে এবং নিরীক্ষিত প্রতিবেদন সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যানের কাছে জমা দিতে হবে। খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সিভিল এভিয়েশনের অনুমতি ছাড়া কোনও যন্ত্রপাতি বেচাকেনা করতে পারবে না গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদের কোনও কর্মকর্তা নিয়োগে সিভিল এভিয়েশনের অনুমতির বিধানও রাখা হয়েছে। এছাড়া, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনও শ্রমিক ইউনিয়ন, সংস্থা বা কোনও সংগঠন করতে পারবে না।
সূত্র জানায়, জিয়াউল কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ৩০ এপ্রিলের ওই বৈঠকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালক (কাস্টমার সার্ভিস) আতিক সোবহান লিখিত কিছু সংশোধনী প্রস্তাব করেন। এই সংশোধনী প্রস্তাবে বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিমান সরকারি ক্রয়নীতি ও জনবল নিয়োগ করে। এজন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে ও যন্ত্রপাতি কেনায় সিভিল এভিয়েশনের অনুমতি নেওয়া থেকে বিমানকে অব্যাহতি দিতে হবে এবং বিমানের জন্য লাইসেন্স ফি ১০ লাখ টাকা ও নবায়ন ফি ৫ লাখ টাকা করতে হবে। এছাড়া, বিমানের জন্য রয়েলটি ফি ও জামানত মওকুফের বিধান রাখারও প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও সিভিল এভিয়েশনের উপ-পরিচালক প্রশান্ত কুমার চক্রবর্তী বিমানের জন্য আলাদা নীতিমালা রাখা সমীচীন হবে না বলে মত দিয়েছেন।
জানা গেছে, সর্বশেষ গত ৪ জুন মন্ত্রণালয়ে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা রেগুলেশন প্রণয়ন করতে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরক্তি সচিব (বিমান ও সিভিল এভিয়েশন) এ এইচ এম জিয়াউল হককে আহ্বায়ক করা হয়েছে। সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের সভাপতিত্বে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং রেগুলেশন প্রণয়ন-সংক্রান্ত সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আইন, বিচার ও সংসদ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়, কাস্টমস, এনবিআর, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বেসরকারি এয়ারলাইন্স ও প্রাইভেট কার্গো এয়ারলাইন্সের প্রতিনিধিরা এ কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন। কমিটিকে ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে রেগুলেশন জমা দিতে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে পাস হওয়া সিভিল কর্তৃপক্ষ আইনের আওতায় এ রেগুলেশন প্রণীত হবে।
এ প্রসঙ্গে বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরক্তি সচিব ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা রেগুলেশন কমিটির আহ্বায়ক জিয়াউল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাকে লাইসেন্সের আওতায় আনার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিভিল এভিয়েশন তাদের মতো করে লাইসেন্স ফিসহ অন্যান্য ফি প্রস্তাব করেছে। রেগুলেশন কমিটির পর্যালোচনা শেষে সবকিছু চূড়ান্ত করা হবে। আশা করছি, এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্য রেগুলেশন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।’
প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রয়াত্ত্ব বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যাত্রী পরিবহন ছাড়াও দেশের বিমানবন্দরগুলোর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা এককভাবে দিয়ে যাচ্ছে। তবে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবার মান নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর পরিপ্রেক্ষিতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবার মান বাড়াতে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে বিমান হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিজস্ব ফ্লাইট ছাড়াও ২৬টি বিদেশি এয়ারলাইন্সের ১৮ হাজার ৬শ ২৮টি ফ্লাইট হ্যান্ডলিং করেছে। ২০১৬ সালে ডিসেম্বর মাসে বিমানের নিজস্ব ১৪১৬টি ফ্লাইট ও ২৬টি বিদেশি এয়ারলাইন্সের ২ হাজার ২১৭টি ফ্লাইট হ্যান্ডলিং করেছে।
আরও পড়ুন-লন্ডন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী
কূটনীতিক গ্রেফতার ভিয়েনা কনভেনশনের লঙ্ঘন: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
/টিআর/