মধ্যবিত্তের টানাপড়েনের ঈদ

মধ্যবিত্ত পরিবারের ঈদে কেনাকাটার চেষ্টা (ছবি- ফোকাস বাংলা)‘কষ্টের কথা না যায় বলা, না যায় সওয়া’— এমন মন্তব্য বেরিয়ে এলো আবদুল হালিমের মুখ থেকে। তিনি একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা। মা, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তার সংসার। চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। মাসে বেতন সর্বসাকুল্যে ৪০ হাজার টাকা। থাকেন ঢাকার বাসাবো এলাকায়।
দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে অষ্টম আর মেয়ে পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। ভালো ফলের জন্য  দু’জনেরই প্রয়োজন প্রাইভেট টিউটরের। কারণ একজন দেবে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), অন্যজন দেবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি)। প্রাইভেট টিউটর রাখা হয়েছে তাদের জন্য।

প্রতি মাসে ছেলেমেয়েদের স্কুল ও প্রাইভেট টিউটরের বেতন মিলিয়ে খরচ ১০ হাজার টাকা। বাসাভাড়া দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। অসুস্থ মায়ের ও নিজেদের প্রয়োজনীয় ওষুধের পেছনে যায় ৩ হাজার টাকা।

পানি, গ্যাস বিদ্যুৎ, নাইটগার্ড, ডিশ অ্যান্টেনা, ময়লা পরিষ্কারের জন্য সিটি করপোরেশনের বিলসহ অন্যান্য মিলিয়ে ইউটিলিটি চার্জ দেন আড়াই হাজার টাকা। অফিসে যাতায়াত ও দুপুরের খাবার হিসেবে নিজের হাত খরচ রাখেন মাসে ৩ হাজার টাকা।

অবশিষ্ট থাকে সাড়ে ১২ হাজার টাকা। তা দিয়ে পরিবারের সবার খাওয়া-দাওয়ার জন্য মাসের বাজার ও অন্যান্য খরচ মেটাতে হয় আবদুল হালিমকে। নিজের সংসারের হিসাব তুলে ধরে উল্টো জানতে চান- ‘কী খাই, তা আপনিই বলেন?’

আবদুল হালিম বললেন, ‘গত ৪ জুন মে মাসের বেতন পেয়ে সব পাওনা মিটিয়ে বাজার করেছি। জুন মাসের ১৫ দিন চলে গেছে, বেতন পেতে সামনে আরও ১৮ দিন পার করতে হবে। এ মাসে বাড়তি আয় নেই, চলছে রোজা। এজন্য বাড়তি খরচের কথা বললাম না। তবে সামনে ঈদ। জুনের বেতন পাবো জুলাই মাসের ৪ অথবা ৫ তারিখে। তবে এ মাসে ঈদ বোনাস পাবো ২০ হাজার টাকা। এই টাকায় দুই ছেলে মেয়ে, স্ত্রী ও মায়ের জন্য নতুন কাপড় কিনতে হবে। নিজের কথা পরে বলি। কারণ বছরের এই এক ঈদেই একটু ভালো কাপড় কেনা হয়। যা দিয়ে সারাবছর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা বেড়ানোর সময় ব্যবহার করা লাগে। এরপর থাকে ঈদের বাড়তি কেনাকাটা, জাকাত-ফিতরা। তারপর যদি ঈদের সময় গ্রামের বাড়ি যেতে হয়, সে খরচও মেটাতে হবে এই বোনাসের ২০ হাজার টাকা থেকেই।’ এবার তার প্রশ্ন—‘বলেন, কেমন ঈদ আনন্দ হবে আমার ও আমার পরিবারের?’

ঈদের জন্য আয়োজন করতে গিয়ে টানাপড়েনে পড়ে আক্ষেপের সুরে আবদুল হালিম বলেন, ‘জানেন, উপহার দিতে বাড়তি খরচ হবে বলে কোনও আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের বাসায় বা কোনও অনুষ্ঠানে যাই না। কোনও বিয়ে, জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও যাই না। এই হলো আমাদের জীবন। এর মধ্যেই আনন্দ খুঁজতে হয়।’

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে রাজধানীতে এমন মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। যাদের মাসিক আয় ৪০ হাজার টাকার নিচে তাদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। বর্তমানে মধ্যবিত্তের সব ব্যয় নির্বাহ করে সমাজে টিকে থাকাটাই কঠিন। বর্তমান বাজার বাস্তবতায় এ শ্রেণির মানুষের অবস্থা খুবই নাজুক। এই মানুষগুলো কোনোরকম পেটে-ভাতে টিকে আছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যতই বলা হোক মানুষের আয় বেড়েছে, আসলে তা দিয়ে দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো খুবই কষ্টসাধ্য। ফলে কষ্টের বিষয়টি থেকেই যায়। একজন অসহায় ও গরিব মানুষ সবার কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাততে পারেন, কিন্তু মধ্যবিত্ত মানুষেরা তা পারেন না। ফলে তার কষ্টের কথা না বলা যায়, না জানা যায়।’

একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম। সম্প্রতি তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘মধ্যম আয়ের দেশ, এই ধারণা ভিত্তিহীন। আবার সরকারের পক্ষ থেকে যে মাথাপিছু আয়ের কথা বলা হয়, এগুলো সব ভুল কথা। একজনের আয় ১৯ লাখ আর আরেক জনের আয় ১ লাখ মিলিয়ে যদি বলি দু’জনের মাথাপিছু আয় ১০ লাখ তাহলে তো আর সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে না।’

অধ্যাপক ড. নেহাল করিম আরও বলেন, ‘গাড়ির ট্যাক্স কমানো হয়েছে, এতে সাধারণ মানুষের কোনও উপকার হবে না। কারণ দাম কমালেও গ্রামের একজন কৃষক কখনও গাড়ি কিনতে পারবে না। সম্প্রতি বলা হচ্ছে— দেশ ডিজিটাল হচ্ছে, ফ্লাইওভার, সেতু তৈরি হচ্ছে। এগুলো দেশের সাধারণ জনগণের কোনও উপকারে আসবে না। মধ্যবিত্ত বা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে হলে দরকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যাপকভাবে বিদ্যুতায়ন, কৃষিপণ্যের দাম বৃদ্ধি। যদি এসব করা সম্ভব হয় তাহলে মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মান বাড়বে। সাধারণ মানুষের উপকার হবে।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী এখন ব্যয় বেশি। এই ব্যয় মেটানোর আয় নেই মানুষের। আর মধ্যবিত্তরা তো আছেন মহাবিপদে। তারা কোথাও যেতেও পারেন না। বাসায় ভালো খেতেও পারেন না। এ কথা কাউকে বলতেও পারেন না। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে মানুষের আয় বাড়াতে হবে। নিত্যপণ্যের দাম রাখতে হবে নিয়ন্ত্রণে।’

/এসএমএ/জেএইচ/